Wednesday, September 2, 2009

এক রবিবার



ডিসেম্বর মাসের রবিবারের সকাল।কাচের জানলার পরদার আড়াল থেকে ভোরের একটা নরম আলো এসে পড়েছে শ্রীনন্দার খাটে। কম্বল দিয়ে সে আপাদমস্তক ঢাকা। ছটা বাজতে না বাজতেই অ্যালার্ম ঘড়িটার মাথায় এক চাপড় মেরে সে উঠে বসলো।
ব্রাশ করতে করতে সে ভেবে নিল এরপর ব্রেড টোস্ট করে খেয়ে নিয়ে চানে যাবে। এরকম নিয়ম মাফিক তার সকালটা কাটে অফিস যাওয়ার আগে। মা পুজায় ব্যস্ত, কি যে দরকার এত সকাল সকাল কাজ করার শ্রী বুঝিয়ে পারেনা। গতবছর তিনি একটা বড় আটাক থেকে রক্ষা পান। বাবা চলে যাওয়ার পর তিনিই তো শ্রীর একান্ত আপনার। ভাজ্ঞিস সেদিন জয় ছিল নইলে সে একা একা কি যে করতো…।
ব্রেড টোস্ট করে টেবিলে রাখতেই ফোন বেজে উঠলো। বাঙ্গালোর থেকে ফোন, জয়ের আওয়াজ পেয়ে সে চিৎকার করে উঠলো, “ এতদিন বাদে মনে পড়লো বুঝি?” জয় বেশ খোশ মেজাজে, “বন্ধুদের হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে না, তারা তো মনেতেই থাকে।” “ ও তাই! এই বুঝি মনে রাখার নমুনা - ছয় মাস হয়ে গেল ট্রান্সফার হয়ে সেই যে গেলে , তারপর আর তো কোনো পাত্তাই নেই” “ না, আমি কিছুদিন আগে একবার ফোন করেছিলাম, তুমি বাড়ি ছিলেনা সেদিন , তোমার মায়ের সাথে কথা হল।” “ও হ্যাঁ, মা বলার পর আমি একদিন করেছিলাম কিন্তু তুমি মনে হয় বাঙ্গালোরে ছিলেনা।” “হ্যাঁ, গতমাসে সে সময় দিল্লী গেছিলাম কাজে…যার জন্য ফোন করা, তুমি জানো তো যে এই বছরের শেষ সপ্তাহটা আমি কলকাতায় কাটাবো?” শ্রীর চোখদুটো খুশিতে চিকচিক করে উঠলো,“ সত্যি?” “হ্যাঁ, তোমার মাকে বলেছিলাম, হয়ত উনি…আসলে কয়েকটা বেশ দরকারি কাজ আছে, দেখা হলে বলবো।”
ব্রেডে কামড় বসাতে ব্যস্ত শ্রী, যমুনাদি ঘর ঝাড়তে এসে বললো, ‘তুমি সবেতে এত তাড়া কেন করো বলোতো, রোব্বারেও তোমার কিসের এত তাড়া?” শ্রীর ওমনি মাথায় হাত, “ঘুম থেকে উঠে অব্দি ভাবছি আজ শনিবার!” যমুনাদি বেচারীমুখে বললো,”ঈস আমি যদি আগে জানতাম তুমি অফিসে যাওয়ার জ ন্য তাড়াহুড়ো করছ তবে কখন বলে দিতাম, যাও দিদি একটু শুয়ে নাও, পরে উঠো।” শ্রী হেসে ফেললো,“না...গো আ-র ঘুম, এই ঘুমটা দুপুরেই পোষাতে হবে দেখছি।”
চায়ের কাপ নিয়ে শ্রী বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।শীতের হাল্কা রোদের সাথে সাথে একটা ফুরফুরে হাওয়া।সপ্তাহের ব্যস্ত দিনগুলোতে এসময় তার হাতে একটুও সময় থাকেনা।তাই এ সকালটা তার অদেখা।শ্রী আনমনা হয়ে ভাবতে লাগলো ...এবার ক্রিসমাসটা দারুন যাবে।
জয় ওর কলেজের বন্ধু।নতুন চাকরীস্থলে গিয়ে আবার যখন সে জয়ের দেখা পায় তার আগে তিন্টে বছরে ওর জীবনে অনেক ঝড় ঝাপটা এসেছে। শ্রী বাবাকে হারিয়েছে,কোয়াটার ছেড়ে মাকে নিয়ে মামাবাড়িতে চলে আসতে হয়েছে।চাকরীর নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে জয় তাকে সাহায্য করেছে।আর সেদিন?যেদিন রাতে মায়ের হার্ট আটাক করেছিল?...কথাটা মনে এলে আজও ওর গায়ে কাটা দেয়।মামা-মামী এক আত্মীয়ের বিয়েতে গিয়েছিলেন শিলিগুড়ি।নিরুপায় হয়ে শ্রী জয়কে ফোন করা মাত্রই সে এসে যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিল।
রাস্তার মোড়ের এক কোণে ফুল ওয়ালাটা আজ হরেক রঙের গোলাপ নিয়ে বসেছে।হঠাৎ কি মনে হওয়াতে শ্রী জ্যাকেট গলিয়ে কিছু টাকা নিয়ে বেড়িয়ে গেলো।কিনে আনলো এক গোছা টাটকা গোলাপ।
ফ্লাওয়ারভাসে এক গোছা গোলাপ সাজাতে ব্যস্ত শ্রী।জয় যখন ওর পাশে ছিল সে কখোনো বোঝেনি যে তার অনুপস্থিতি তাকে কতটা একাকীত্ত্ব দেবে। যমুনা ফুলের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত হয়ে বলল, “কি গো দিদি এতগুলো হলুদ আর একটা মাত্র লাল?!”শ্রী মুচকি হেসে বলল, “ ভাল লাগার জিনিস একটা থাকাই ভালো।”
মা ডাইনিংরুমে ঢুকে অবাক সুরে বললেন, “ফুল কিনে আনলি?...বাহ ভালো একটু একটু সুমতি হচ্ছে তাহলে!” “সুমতি কেন?...ইচ্ছে হল ফুল গুলো দেখে কয়েকটা কিনে আনতে তাই নিয়ে এলাম...ধরে নাও রবিবারের ছুটির খুশিতে” মা হেসে বললেন , “বেশ করেছিস...কে ফোন করেছিলো রে?জয়?” মায়ের হাসি দেখে ওর গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল।কোনোরকমে নিজেকে আড়াল করতে ব্যস্ত হয়ে বারান্দায় ভেজা জামাকাপড় মেলতে লাগলো,সেখান থেকেই বলল, “ ও বলল এই মাসের শেষে ও আসতে পারে।” মা হেসে উঠলেন, “আসতে পারেনা, আসবে। ওর সাথে আমার কথা হয়েছে।ওর মা বাবা ওর বিয়ে দিতে চায় তাই ছুটি ও কাটাতে আসছে আর সম্বন্ধ ও দেখতে আসবে...এক ঢিলে দুই পাখি আর কি!” শ্রী-এর দুহাত বেয়ে ভেজা কাপড় নিঙড়ে যত জল পড়ছে বালতিতে, ওর চোখদুটো তত ঝাপসা হয়ে আসছে।
ট্রীং ট্রীং শব্দ করে একটা ট্রাম রাস্তার বুক চিড়ে চলে গেলো। চমক ভাঙলো শ্রী-র, হাতের তালু দিয়ে তাড়াতাড়ি চোখ মুছলো সে।মায়ের সামনে যে করেই হোক নিজেকে ঠিক রাখতে হবে।কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলোনা। মা যে কখন নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন তা সে টের পায়নি। পেছন থেকে মা জড়িয়ে ধরে বললেন, “কি রে এ দেখছি যেমনি তুই তেমনি সে! আজও বুঝি সে বলেনি তার আসার কারণ?” শ্রী রাগ দেখিইয়ে বলল, “ কি যে বলো?সে কি কাজে আসছে সব আমায় বলতে হবে?এইতো তুমি বললে, জেনে গেলাম” -“মিছিমিছি কেন রাগ করছিস, সম্বন্ধ দেখতে আসছে তা না হয় জানলি, পাত্রী তো সে দেখেই রেখেছে আর সে হলো তুই!” শ্রী অবাক হয়ে ওর মায়ের দিকে তাকালো...উনি মুচকি হেসে বললেন, ‘আমাকে ও বলেছিল তোর মতামতটা জানতে...তা আমি বলেছিলাম এখানে এসে সে কাজটা ওকেই করতে হবে...তা এখন দেখছি, ওর আর খুব একটা খাটনি হবে না!!”-শ্রী ওর মাকে জড়িয়ে ধরে লজ্জায় লাল হয়ে বলল, “ওঃ তুমি না সত্যি!!!”




আমি প্রিয়াঙ্কা সান্যাল। ইউ এস-এতে থাকি। অবসরে ভাললাগে গল্পের বই পড়তে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে আর ছবি আঁকতে।

6 comments:

  1. daarun laaglo priyanka....climax ta bhari misti ..onekdin mone thakbe

    ReplyDelete
  2. khub bhalo laglo Priyanka....agamu dine tomar kach theke erokomi monke chuye jaoa lekha pabar ashay roilam.

    ReplyDelete
  3. khub bhalo legeche tor golpo ta pore
    chotho mishti golpo

    ReplyDelete
  4. khub misti galpo priyanka...khub bhalo laglo....

    ReplyDelete