Wednesday, September 2, 2009

ফোর্ট রক

আমি হানা স্ত্রেটন, মিস্টার ফ্রেড স্ত্রেটনের স্ত্রী। ৭ বছরের ফ্রাঙ্ক আর ২ বছরের লেউইসকে নিয়ে প্রথমে লন্ডন থেকে মিশিগান আর তারপর মিশিগান থেকে এই জন মানবহীন ধূ ধূ প্রান্তরে এসে বাসা বেঁধেছি। এই জায়গাটার নাম ফোর্ট রক। সমুদ্র থেকে বেশ কিছুটা পূবে। চারপাশে বেশ কয়েকশো মাইল শুধু'ই অনুর্বর বাজা পাথুরে জমি। এখানে কোনো ফসল জন্মায় না, ফুল ফোটে না, ফল ফলে না। বেশ খানিকটা দূরে উচু পাথরের দেওয়ালের মত পাহাড় প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে। শুনেছি এক সময় নাকি
ওখানে কিছু ইন্ডিয়ান (রেড ইন্ডিয়ান) বাস করতো। এখন যে তারা নেই সে কথা হলফ করে বলতে পারি না। সন্ধ্যের পরে গা ছমছম করে। মনে হয় এই বুঝি ফোর্ট রকের পিছন থেকে বিষ মাখানো তীর ছুটে আসবে। ১৯০৫-এ ফ্রাঙ্কের জন্মের পর থেকেই ফ্রেডকে বলতে শুনছিলাম যে বেশ খানিকটা পশ্চিমে পাইনের ঘন জঙ্গল ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা জমি ফাকা পড়ে আছে। আমাদের কয়েকজন বন্ধু সেখানে গিয়ে বাস করবার কথা ভাবছেন। ফ্রেড জানিয়েছিলো তার'ও ইচ্ছে ওই অঞ্চলের কলোনিতে গিয়ে বাস করে। তখন ওর কথা অত মন দিয়ে শুনিনি। ভাবতেও পারিনি যে সত্যি সত্যি একদিন দুটি শিশুসন্তান, সংসারের টুকিটাকি জিনিষপত্র, সমবতসরের রসদ ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে আমরা এই অঞ্চলে এসে ঘর বাধবো। ফোর্ট রকে এসে দেখলাম আমাদের আগে আরো বেশ কয়েকজন স্বজাতী বন্ধু বান্ধব এখানে সপরিবারে এসে আস্তানা গেড়েছেন। এদের মধ্যে ডঃ থমস-ও আছেন। ডঃ থমস মিনেসোটা থেকে ডাক্তারি পাস করে এসে এখানে একটি ছোট্ট ২ ঘরের ডাক্তারখানা খুলে বসেছেন। আমরা ছাড়া'ও মিঙ্কেন্মিয়ের, বয়েডিঘেমেয়ার, ওয়েবস্টার, বেলেটেবল পরিবার এসে বাসা বেধেছেন ফোর্ট রক কলোনিতে। আমার স্বামী ফ্রেড খুব ভাল কাঠের কাজ জানেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একটি দু কামরার কেবিন বানিয়ে ফেললেন আমাদের জন্য। ধূ ধূ প্রান্তরে শুরু করলাম নতুন জীবন। অল্প সময়েই একখানা পোস্ট অফিস, একটা স্কুল আর একটা উপাসনালয় তৈরি করে ফেললাম। একটা কামারশালাও তৈরি করা হল। কাছাকাছি দোকান বাজার লোকালয় আর দ্বিতীয় ছিল না। ফলে কলোনির পুরুষেরা পালা করে ঘোড়ার গাড়ীতে করে নিয়ে আসতেন ৬ মাসের রসদ- ময়দা, তামাক, মদ,জ্বালানী, কাঠ, আলু, বেবিফুড। এ অঞ্চলে খুব জল কষ্ট। পাথুরে মাটি-র এই দেশে আশেপাশে কোনো জলাশয় ছিল না। সব দেখেশুনে
আমার স্বামী ১৯৬ ফু্ট গভীর একটি কূয়ো তৈরী করলেন। কূয়োর জল বারেল প্রতি ৩ পয়সাএ আমরা অন্যদের কাছে বিক্রি করতে শুরু করি। সেদিন নিজের কেবিনের দাওয়ায় বসে লেইউসের জন্য একটা মোজা বুনছিলাম। হঠাত শুনলাম মেঙ্কেন্মায়ারের কেবিন থেকে চিতকারের শব্দ ভেসে আসছে। এই পরিবারে জর্জ আর তার তরুনী স্ত্রী হেজেল থাকে। হেজেল গর্ভবতী, তবে এখনি তো শিশুটির জন্মাবার সময় হয় নি! এদিকে হেমন্ত প্রায় শেষের মুখে, আর দু তিন সপ্তাহের মধ্যে জমিয়ে ঠান্ডা পড়বে বলে মনে হয়। আজকাল বিকেলের পরে সূর্যাস্ত হলেই আর বাইরে আসা যায় না। আমাদের কেবিনে শীত না মানলে সকলে উপাসনালয়ের বড় ঘরে চলে যাই। পুরু কাঠের দেওয়ালে, ধাতব ফায়ার প্লেসে কাঠ জ্বালিয়ে গরম করে নিই নিজেদের। আমি হাতের কাজ পাশে রেখে তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম হেজেলের কেবিনের দিকে। এ সময় কলোনির পুরুষেরা কামারশালার দাওয়ায় বসে মদ্যপান করেন, গল্পগাছা করেন, মাঝেমধ্যে পোকার খেলেন কামারশালার দিক থেকে ওদের উচু গলার চেচামেচি ভেসে আসছে। আমি আমার ঘন নীল রঙের ক্লোক টা গায়ে কোনো রকমে জড়িয়ে ছু্টে গেলাম মেঙ্কেন্মায়ারের কেবিনের দিকে।

।।২।।

হেজেলের প্রসবযন্ত্রনা রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে শুরু করলো। এদিকে আজ যেন প্রকৃতি'ও বিরূপ। ঠান্ডা পরেছে, বাতাস জোরে বইছে, মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে। ডাঃ থমস গত সপ্তাহে প্রয়োজনীয় কিছু অসুধ পত্র আনতে মিঃ সাইমনকে নিয়ে পাইনের জঙ্গল পেড়িয়ে উইলিয়ামেট ভ্যালিতে গিয়েছেন। সব কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে আরো সাত আট দিন ত লাগবেই। এদিকে প্রচন্ড যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে মেয়েটি। সতের বছরের মেয়ে , প্রথমবার মা হতে চলেছে; ভয়ে, যন্ত্রনায় ওর ফরসা মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমি আর গ্লেন অর মাথার কাছে বসে আছি। মাথাইয় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, মুখ মুছিয়ে দিচ্ছি; কিন্তু কোনোভাবেই ওকে আরাম দিতে পারছি না। কলোনিতে আনেক কষ্টে এক ফালি পশুচারন জমি তৈরী করা হয়েছে। এই রুক্ষ জমিতে ঘাস জমি তৈরী করা যে কি কষ্টকর কাজ , তা শুধু আমরাই জানি। দুটি গরু, একটি বাছুর আর ৫ টা ভেড়া পালন করা হয়েছিল। জর্জ গিয়ে এক পেয়ালা গরম দুধ নিয়ে এলেন, ফায়ার প্লেসে গনগনে আগুন জ্বালান হল; কিন্তু এতো করেও হেজেলের যন্ত্রনা কিছুমাত্র কম করতে পারছিলাম না আমরা। নিস্তব্ধ রাত্রিকে খন্ড বিখন্ড করে তরুনী মায়ের আর্তনাদ দুরের পাহারের গায়ে আছড়ে পড়েই আবার ফিরে আসছিল আমাদের'ই কানে। আজ কলোনির সব বাচ্চারা এক সাঙ্গে সান্ধ্য ভোজন সেরেছে। ওদের সবাইকে আলেন্স বেলেটেবেলের স্ত্রী নিজে হাতে রান্না করে স্যুপ আর রুটি খাইয়েছেন। নিজের কেবিনের দোতলার সুন্দর ঘরটিতে সকলের শোবার ব্যাবস্থা করেছেন। এই কলোনির সবচেয়ে সুন্দর কেবিনটি ওদের। বেলেটেবেল পরিবার ফ্রেঞ্চ। ওদের বাড়িতে কলের গান, সেলাই মেশিন ইত্যাদি রয়েছে। নিঃসন্তান এই পরিবার অত্ত্যন্ত শৌখিন। সাধারনতঃ অন্যদের সঙ্গে কম কথা বলেন। মিঃ বেলেটেবেল দামি চুরুট খান, মিসেস বেলেটেবেল রবিবার উপাসনালয়ে লেস লাগানো সুন্দর সুন্দর গাউন পরে মাথার চুলে পরিপাটি খোপা বেধে , খাস ফ্রেঞ্চ সুগন্ধী গায়ে মেখে অরগান বাজান। যে মিসেস বেলেটেবেল রাজহন্সীর মত গ্রিবা নিয়ে অতি কম কথা বলে নিজেকে সকলের কাছে নাক উঁচু বলে পরিচিত করেছেন, তিনি'ই আজ এই বিপদের রাতে কলোনির সব কটি বাচ্চার খাওয়া শোবার ভার নিলেন। আমি আর গ্লেন হেজেলের সয্যার পাশে ঠায় বসে রইলাম। পুরুষেরা যে যার মত সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে হাতে মদের পেয়ালা নিয়ে আবার গিয়ে বসলেন কামার শালার গঙ্গনে আগুনের আঁচের সামনে। জর্জকে অভিজ্ঞ পিতারা নানা রকম আস্বাস দিতে থাকলেন। একটু বেশী রাতে ঝড় উঠল; কী ভয়ঙ্কর সে ঝড়! মনে মনে ঈশ্বরকে স্মরন করতে লাগলাম। মনে পরে গেল লন্ডনের পথঘাট, দোকান বাজার, আলো ঝলমল বাড়ি, প্রাসাদ অট্টালিকা। কি কুক্ষনে যে সে সব ছেড়ে এ অনুর্বর জনমানবহীন প্রান্তরে এসে বাসা বেধেছি! আকাশে বিদ্যুতের ঝিলিক,অবিশ্রান্ত বর্ষন, নাম না জানা পকা মাকড়ের শব্দ, হেজেলের আর্তনাদ সব মিলিয়ে ফোর্ট রক আমাকে অবসন্ন করে তুলছিল।

।।৩।।

আকাশে মেঘ সরে গেছে। এখানে সূর্যোদয় দেরিতে হইয়, ফ্রেড তার পকেট ঘড়িতে সময় দেখলেন, সকাল ছটা বারো। কাল সারারাত কেউ ঠিক মত ঘুমান নি, সকলেই ঝিমুচ্ছিলেন। একটি মানব শিশুর প্রথম কান্নার শব্দে সকলে চোখ মেলে উঠে বসলেন। জন্মের সূচনা, জীবনের শব্দ ফোর্ট রকের পাথুরে জমিতে নিজের আগমন বার্তা রটিয়ে দিল। আমাদের কলোনিতে আমাদের সঙ্গে বাঁচার যুদ্ধে যোগ দিতে হেজেলের কোলে এল ছোট্ট বিয়াত্রিস।।


{ফোর্ট রক , অরেগন,উত্তর আমেরিকার, এই কলোনির বাসিন্দারা কয়েক বছ রের মধ্যে অন্যান্য জায়গায় চলে যান। মিঃ ফ্রেড স্ট্রাটন এবং তার স্ত্রী মিসেস হানা স্ট্রাটন ( যার জবানীতে এই কাহীনি লেখা হয়েছে) ১৯১৫ এ তাদের পুত্র ফ্রাঙ্ক আর লেউইস্কে নিয়ে এ অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
ফ্রাঙ্ক স্ট্রাটন এবং তার স্ত্রী ভিভিয়ান ১৯৮৮ সালে এই স্থানে ফোর্ট রক হিস্টরিকাল সোসাইটি এবং মিউসিয়াম প্রতিষ্ঠা করেন।
আজ'ও ওরেগনের আওটব্যাক সিনিক ড্রাইভ দিয়ে যেতে যেতে ধূ ধূ বালিয়ারী আর রুক্ষ পাথরের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে থাকা ফোর্ট রক আর তার সামনে অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট কলোনিটি এখনো কোনো কোনো পথিককে হাতছানি দিয়ে ডাকে। নিয়ে চলে যায় একশ বছর আগের সেই সব সংঘর্ষের দিনে রাতে।}






আমি শ্রদ্ধা। বলার মত বিশেষ কিছু নেই। সামান্য মানুষ। ঘর সংসার, স্বামী, সন্তান নিয়ে জীবন। ভালবাসি সৃষ্টিশীল যে কোন কাজকে। মানুষকে বিশ্বাস করি ও ভালবাসি। সহজ জীবন কাটাতে চাই।

7 comments:

  1. Khub bhalo laglo Shraddha...keno janina porte porte amar US Televison-er bohu din agekar ekta serial "Laura Ingalls"-er "Little House on the Prairie" -er kotha mone porchhilo

    ReplyDelete
  2. তোর লেখাটা এতো সুন্দর,যে পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম এটা কি সেই সাধারণ মেয়েটার লেখা না কোন বড় স্বনাম ধন্য কোন লেখিকার?

    ReplyDelete
  3. Besh sundor bNadhon er lekha. Darun likhechhis...

    ReplyDelete
  4. tomader bhalo legechhe jene amaro khub bhalo lagchhe..:)
    Shraddha.

    ReplyDelete
  5. sadharan meye-r asadharan sristi....

    ReplyDelete