Thursday, September 3, 2009

ঘরের ভিতর ঘর



কিছুদিন আগেই বেশ ঘটা করে লোকসভা নির্বাচন হয়ে গেল। সুখে দুঃখে মানুষের হাত ধরার, দেশের সার্বিক উন্নতির অঙ্গীকার করে যথারীতি নেতারা নিজেদের কুর্সিতে বসলেন।
অদ্ভুতভাবে তার কিছুদিন পরেই আমার সুযোগ হয়ে গেল আমাদের দেশের এমন একটি অঞ্চলে যাওয়ার, যেখানে জনগণ তো বাস করে কিণ্তু গণতন্ত্রের দেখা নেই। দেশের মানচিত্রে তার ঠাঁই হয়েছে ঠিকই কিণ্তু তার অস্তিত্বহীনতা চোখে পড়ার মত!!

জায়গাটি বীরভূমের সীমান্তে, কিংবা বলা চলে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। সীমান্ত বা বর্ডার - শব্দগুলো শুনলেই দেশ, পররাষ্ট্র নীতি, আন্তর্জাতিক আইন…. আরো কত কথাই না মনে আসে। সিনেমায় দেখা কিছু খণ্ডচিত্র ভেসে আসে। বর্ডার মানে কি battle field? অথবা no man’s land? প্রশ্ন জাগে। কারণ ‘বর্ডার’ দুটো জায়গার মধ্যে বিভাজনকেই শুধু নির্দেশ করে না, বর্ডার নির্ধারণ করে সেই সীমান্তবর্তী মানুষের ভাগ্যকেও।
এই জায়েগাটা দেখার আগে আমি জানতাম বর্ডার মানে ‘ইণ্ডিয়া-পাকিস্তান’। বর্ডার মানে বন্দুকধারী সৈন্যবাহিনীর টহলদারী, বর্ডার মানে বর্ডারের ওপারে যেতে গেলে সরকারী ছাড়পত্র লাগে।

এটিও একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল। তফাৎ এইটুকু কোনো কাঁটাতার এখানে নেই। অন্তত চোখে দেখা গেল না। একদিকে পশ্চিমবঙ্গ, অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড। গ্রামের নাম ‘বাগডোহরী’ । আমার পরিচিত একজনের বাড়ী ওখানেই, সেই সূত্রেই যাওয়া। রাণীগঞ্জ থেকে গাড়ীতে ঘন্টা দুয়েক। সিউড়ি থেকেও তাই হবে। যাওয়ার সময় টলিউডের একদা অনেক হিট ছবির নায়িকা, অধুনা সাড়া জাগানো রাজনীতিবিদ শতাব্দী রায়-এর লোকসভা কেন্দ্র পার করলাম। কখন যে বীরভূম ছাড়িয়ে ঝাড়খণ্ডে ঢুকে পড়েছি টৈরও পায়নি। ভূগোলের ম্যাপ অনুযায়ী একটা সীমান্ত পার করে ফেলেছি। কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম বাংলার শেষ গ্রামটি পার হতে না হতেই আর কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না !! একটা ছোটো জলা বা ডোবা আমাদের গাড়ী এমনিই পার করল। এরপর পাথরফেলা এবড়ো-খেবড়ো পথ। কখনো দুপাশে জঙ্গল। একটু দূরে একটা জনপদ দেখা যায়। ওখানেই আমাদের গণ্তব্যস্থল। যে রাস্তা পেরিয়ে আমরা গ্রামে ঢুকলাম, তাকে রাস্তা না বলাই ভালো। ভাবছিলাম আর দুদিন পরে বর্ষায় এখানকার না জানি কি হাল হবে ?
গ্রামে বিদ্যুৎ নেই । অসম্ভব গরমে আমার অবস্হা বেশ খারাপ। প্রায় ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বিনা পাখায় আমাদের শহুরে শৌখিন প্রাণ ওষ্ঠাগত। এরা কি করে থাকে এইভাবে? কিণ্তু বিস্ময়ের পালা তো তখন সবে শুরু হয়েছে। গ্রামে কোনো পাকা বাড়ী চোখে পড়ল না। দু-একখানা বাড়ীর যাও বা দেখা মিলল এখন তাদের জীর্ণ ভগ্ন দশা। একটা বাড়ী দেখলাম State Bank Of India, Jharkhand কে দেওয়া হয়েছে।
গ্রামে একটি জাগ্রত শিব মন্দির আছে। মানে অন্তত সেখানকার মানুষ তাই মনে করে। এই গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার আমার পরিচিত লোকটির পূ্র্বপুরুষ । তার কাছেই গল্পটা শুনলাম। জমিদার আসলে সাধারণ এক ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ ছিলেন। একদিন স্বপ্ন পেলেন এই অঞ্চলে একটা জায়েগায় মাটির তলায় সাতঘড়া মোহর রাখা আছে। আর সেই ঘড়াগুলি আগলে আছেন স্বয়ং মহাদেব। সেই ব্রাহ্মণ এসে সাতঘড়া মোহর পেলেন। আর সেখানে ঐ শিব মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করলেন । তারপর গড়ে উঠল এই জনপদ।
আজ জমিদার বা জমিদারী আর কিছুই নেই। পুরোনো মন্দিরটি আছে। নিয়মিত পুজো হয়। আর হয় খুব ঘটা করে গাজন উৎসব । কিণ্তু ভগবান কি তার ভক্তদের দিকে আর ফিরে তাকান? কই, গ্রামের চেহারা দেখে তো তা বোঝার উপায় নেই!!
দু-একজন গ্রামবাসীর সাথে কথা হল। জানতে পারলাম বিগত ৩৫ বছর ধরে সেখানে কোনো ভোট হয় না। কোনো নেতা বা দলের তাই কোনো মাথাব্যথা নেই এলাকার উন্নয়ন নিয়ে। ঝাড়খণ্ড-এ অন্তর্ভূত্তি বেশীদিনের নয়। তার আগে তারা পশ্চিমবঙ্গের অংশ ছিল। এখন অবশ্য অনেকটা ‘না ইধারকা না উধারকা’ গোছের অবস্থা। কেউ দেখে না। একি কাণ্ড!! এও কি সম্ভব? তাহলে কি দুটি রাজ্যের সীমান্তে বসবাসকারী মানুষগুলো এইভাবে বঞ্চিত? তাদের গণতাণ্ত্রিক আধিকারকে অকেজ করে একঘরে করে রাখার দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে ?
তাহলে এদের পেট চলে কি করে ? জানতে চাই । কিছু চাষ জমি আছে। সেখানে ধান, আলু, সবজি যা ফলে সেই দিয়েই তাদের দিন চলে। এরা সবাই দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে, শুধু প্রকৃতির দেওয়া জল-আলো-বাতাস আর পেট ভরার মত শস্য আছে বলেই এরা অনাহারে মরে না !
যদিও সবাই পরিষ্কার বাংলায় কথা বলে, গ্রামে একটিমাত্র স্কুল হিন্দী মাধ্যম ।খাতায় কলমে ঝাড়খণ্ডবাসী লোকগুলো মনে প্রাণে কিণ্তু নিজেদের বীরভূমবাসী, পশ্চিমবঙ্গবাসী মনে করে। পশ্চিমবঙ্গ হোক বা ঝাড়খণ্ড--আসলে তো এরা ভারতবর্ষের নাগরিক । ১০০ কোটির দেশে এই ১০০-২০০ জনের ভোটের সেই অর্থে কোনো মূল্য নেই, তাই চাইতেও কেউ আসে না । তাই স্বাধীনতার ৬০ বছর পরেও( শব্দগুলো অতি ব্যবহারে ক্লিশে লাগলেও কিছু করার নেই!!) সেখানে রাস্তা নেই, আলো নেই, হাসপাতাল নেই---মানুষের বেঁচে থাকার উপযুক্ত পরিবেশ নেই।

ফেরার সময় আমার ঐ পরিচিত লোকটিকে মনে মনে খুব দুষলাম। বললাম, আর কখনো নিজেকে জমিদারের বংশধর বলো না। তোমরা তো জমিদারীর পরে পাওয়া চোদ্দ আনা উঠিয়ে নিয়ে শহরে চলে এসেছ, এদের জন্যে কিছু করার কথা কখনো মনে হয়নি ? এদের জন্যে বলার কি কেউ নেই?
এত খরচা করে ভোট করে আমাদের দেশে বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম গণতণ্ত্রের উৎসব নাকি পালন করা হয় । কিণ্তু সত্যিই কি গণতণ্ত্র রক্ষিত হয় দেশের সবর্ত্র?
একটা ঘরের ভেতর গজিয়ে ওঠা এইরকম অনৃকগুলো বিজাতীয় ঘরই কি বিচ্ছিন্নতাবাদ, বিদ্বেষ প্রাণহানির মূল নয়? এরপরেও আমরা সংখ্যালঘু, বঞ্চিত, গরিব মানুষ গুলোকেই অপরাধী সাব্যস্ত করি খুব সহজেই।।



তখন ক্লাস এইট কি নাইন l জন্মদিনে আমার এক বন্ধু পায়েল, জয় গোস্বামী-র লেখা 'মনোরমের উপন্যাস' বইটা উপহার দিল। সেদিন বাড়ী ফিরে গোগ্রাসে গিললাম পুরোটা। এরপর হঠাৎ মাথায় লেখার ভূত চাপল। কত সহজ, সাবলীন ভাষায় পাঠকের সাথে বার্তালাপ করেছেন লেখক, কবি জয়---সেই দেখে লোভ হল উপন্যাস লেখার। সারাদিন ধরে মাথায় প্লট ভাঁজতাম তখন। না, এখনো পর্যন্ত সেই উপন্যাস লেখা হয়ে ওঠেনি। কিণ্তু আজ পর্যন্ত যা কিছু লিখেছি নিজের জন্য বা সকলের জন্য আমার প্রেরণা 'মনোরমের উপন্যাস'-এর মনোরম।।
'বাংলার বধূ' কে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন একটি প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার জন্য যাকে আঁকড়ে ধরে মনের অপূর্ণ ইচছে গুলো ডানা মেলে উড়তে শিখছে। কে বলতে পারে হয়ত একদিন একটা গোটা উপন্যাস এভাবে জন্ম নেবে।

'বাংলার বধূ' কে অন্তরিক শুভেচ্ছা। সকলের পুজো খুব ভালো কাটুক।।
মৌমিতা চৌধুরী
মুম্বাই

5 comments:

  1. Lekha ta toe bhalo lagloi...tar cheyeo bhalo laglo tomar "Porichiti" ongsho ta...khub sundor...Moumita/Manorom..."M" er mil toe achhei...Uponyash lekha'r mil tao shiggiri hobe ei asha rakhi :)...

    ReplyDelete
  2. khub sundor lekha ta hoyeche moumita... r sotti amio Amreeta r sathe akmot.. porichiti ta r o sundor hoyeche..Nischoye tor Uponyash akdin puro lekha hobe..r amra wait kore thakbo porar jonno:)

    ReplyDelete
  3. khub socchhyo chintashil,somaypojogi lekha. :)
    khuub valo hoyeche. :)

    ReplyDelete
  4. vison sohoj sorol vabe sotti kotha gulo tule dhorechis...ekkothay osadharon....

    ReplyDelete