Sunday, August 30, 2009

হর কি দুন: Valley of Gods




৩১শে মে,দিনটা ছিল আমার জন্মদিন,সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার।যখন তখন বৃষ্টি নামতে পারে।ভোর সাড়ে চারটেতে উঠে চা খেয়ে এগ চাউমিন বানালাম।তার সঙ্গে নিলাম ব্রেড,মিষ্টি,চানাচুর,বাটার ,জল। সকাল ছটায় আমরা মানে আমি আর অনিন্দ্য রওনা হলাম।দুজনের পিঠেই বেশ বড় দুটো রাকস্যক আর ক্যামেরা,সঙ্গে খাবারের মস্ত ব্যগ।ইতিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।তার সঙ্গে চলছে হাওয়া।আমরা তার মধেই স্টেশনে পৌছলাম,তারপর টিকিট কেটে উঠে বসলাম ইন্দোর-দেরাদুন এক্সপ্রেসে।দিল্লি আসতে ১১টা বেজে গেল।আনেক যাত্রী নেমে গেল,উঠল তার দ্বিগুন।বেশিরভাগ যাত্রির গন্তব্য হরিদ্বার।সকলেই গঙ্গাস্নানের পুন্য লাভের জ়ন্য চলেছে।আমরা ব্যতিক্রম। এখন বৃষ্টি থেমে গেছে, ভীষণ গরম ।জল ছাড়া কিছুই খেতে ইচ্ছা করছে না।সঙ্গে যা ছিল তাই খেলাম।সাহারানপুর এসে যখন ট্রেন পৌছল তখন আনেকক্ষন থামল।এখান থেকে ট্র্যাক চেঞ্জ হয়ে গেল।হরিদ্বার পৌছল ২ ঘঃ লেটে।ট্রেন খালি হয়ে গেল।হাত পা ছড়িয়ে বসা গেল।

সাড়ে আটটায় দেরাদুন ঢুকলাম।স্টেশনের কাছেই ১টা হোটেলে উঠলাম।রাতটা কাটিয়ে পরদিন, ১লা জুন সকাল সকাল বাস স্ট্যন্ড চলে গেলাম।।পুরোলাগামী বাসে উঠে বসলাম।বাস ছাড়তে ছাড়তে ৭টা বাজল।বাস তো ভরে গেল। তিল ধারেনর ও জায়গা নেই।।স্থানীয় মানুষেরই ভিড়।পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে বাস ছুটে চলছে।এই রাস্তা দিয়ে আগেও গেছি মুসৌরি বেড়ানোর সময়।আবারও ছবির মত সুন্দর রাস্তা দিয়ে যেতে ভাল লাগছিল।মিষ্টি শীতল হাওয়ায় মন প্রান জুড়িয়ে গেল।৩৫ কিমি দূরে মুসৌরি পৌছতে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগল,রাস্তায় পড়ল কেম্পটি ফলস। বাস থেকেই দেখে নিলাম।এখনো চেনা পথেই চলেছি।কিছুক্ষন পর অচেনা অদেখা পথে যাত্রা,যার জন্যইতো বেড়িয়ে পড়া।যে জায়গায় যাব বলে মনস্থির করেছি,তার সম্পর্কে বই আর ইন্টারনেট ঘেঁটে যা তথ্য পেয়েছি তাই সম্বল করে দুই প্রকৃত প্রকৃতিপ্রেমীকের বেরিয়ে পড়া।না করেছি কোথাও বুকিং, না নিয়েছি গাড়ি,না আছে বড় দল।বেড়িয়ে পড়েছি দুগ্গা দুগ্গা বলে।আর এইভাবে বেরিয়ে পড়ি বলেই তো প্রকৃতিকে অনেক কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করতে পারি।কদিনের জন্য খোলা আকশের নীচে দাঁড়িয়ে বুক ভরে তাজা শ্বাস নিতে পারি।নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পাই।এই পাওনা যে কতখানি অমূল্য তা আমিই জানি।হিমালয়ের আমোঘ টান উপেক্ষা করতে পারি না ,বারবার ছুটে যেতে হয় হিমালয়ের কোলে।এবার আমাদের গন্তব্য ‘হর কি দুন’ ভ্যলি অফ গডস্।গাড়োয়াল দেবভূমি ।তাই প্রাকিতিক সৌন্দর্য অকৃত্তিম।
বাস পুরলা পৌছল দুপুর বারটা নাগাদ। এখান থেকে আর ও ৬০ কিমি যেতে হবে।এখানে gmvn r গেস্ট হাউস আছে।,হোটেল ,রেস্টূরেন্ট।দোকান-বাজার আছে।ট্রেকারস রা এখান থেকে প্রয়জনীও সামগ্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে।এই রুটে এটাই শহর ,এরপর মোবাইল পরিষেবা বা বিদ্যুত আধুনিক সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন কদিন।তবে আজকাল সোলার প্যানেল ডিশ টিভি লাগাচ্ছে কেউ কেউ।এখানে আধুনিকতার পরশ লাগলে বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতে তার প্রভাব পড়বে।মানুষের আনাগনা বেড়ে যাবে তখন ইকোসিস্টেমের ওপর তার এফেক্ট পড়বে।সকাল থেকে আমার শরীর ভাল নেই। আমি কিছু তাই খেলাম না ।কোনো জ়ীপ পাওয়া গেল না তাই বাসেই বাসেই উঠতে হল।বাস যত এগোচ্ছে প্রকৃতিকে তত সুন্দর লাগছে। জানলায় চোখ আটকে আছে।পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে জলধারা নেমে আসছে কখনো সে চঞ্চলা কিশোরী ,কখনো শান্ত পূর্না যুবতী।বাস থামছে ।স্থানীয় মানুষ নামছে উঠছে।বেশিভাগই মহিলা।এদের পোষাক ও গয়নায় রঙের বাহার আর অমলিন হাসি নজর কাড়বে।ঘন্টা দু এক পর পৌছে গেলাম মোরি।অসাধারন জায়গা।পাহাড়,নদী ,সবুজ বনানী ,সব মিলিয়ে ফাটাফাটি ল্যান্ডস্কেপ।থাকার জন্য ফরেস্ট রেস্ট হউস আছে।দুদিন নিরালায় ছুটি কাটানো্র এক দারুন স্পট।এরপর বাস থামল ২১কিমি দূরে নেটোয়াড়ে,গোবিন্দ wild life sanctuary র প্রবেশদ্বার।এখান থেকে প্রবেশ মুল্য দিয়ে অনুমতি নিয়ে তবেই প্রবেশ করা যায়।আমরাও তাই করলাম।এই বনাঞ্চল আকারে ৯৫৭.৯৬৯ বর্গ কিমি।১৯৫৫ ১লা মার্চ তৈরি হয়েছে।বিভিন্ন প্রজাতির পশুপক্ষী ও জীবনদায়ী উদ্ভিদের জন্য সংরক্ষিত। স্নো লেপার্ড ,ব্ল্যক বিয়ার, ব্রাউন বিয়ার, মাস্ক ডিয়ার, গোল্ডেন ইগল এই অঞ্চলে বাস করে।নেটওয়ারে রুপিন ও সুপিন নদি মিলিত হয়েছে, এরপর টন্স নাম হয়েছে।আর ১২কিমি যেতে হবে।বাসেই এক অল্পবয়েসি ছেলের সঙ্গে আলাপ হল, পড়াশোনা করছে, ছুটিতে PORTER র কাজ করে।আমাদের সঙ্গে ছদিন থাকবে ও, নাম চমন। বিকাল ৫টায় সাঁকরি এসে পৌছলাম। gmvnএ উঠলাম। গেস্টহাউস পাহাড়ের মাথায়। ভীষন ঠান্ডা, সঙ্গে কনকনে হাওয়া।মুখহাত ধুয়ে ১টা ছোট দোকানে চাউমিন সঙ্গে চা খেলাম।তারপর আধ কিমি নীচে সর্ গ্রাম ঘুরে এলাম।চমনের বাড়িতে কিছুক্ষন কাটালাম।আমাদের ক্যামেরার সেল আর একবার চার্জ করলাম ।সাঁকরি্তে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে, দূরে পাহাড়ে রঙের ছটা। পাহাড়ে আঁধার নামবে। তার আগেই ফিরে এলাম গেস্টহাউসে। ঠাণ্ডা আরও জমিয়ে পড়ছে। এখানে ঘরে ঘরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে কিন্তু তার দেখা আমরা পেলাম না। ঘরে মোমবাতি জ্বেলে বসে না থেকে চেয়ার নিয়ে বাইরে বসলাম। চাঁদের আলোয় চারদিক ভেসে যাচ্ছে, দু এক দিন পর পুর্ণিমা। মনে হচ্ছিল সব ছেড়ে এখানে এসে থাকলেই তো পারি।এ খানকার কেয়ারটেকার নানাজি আমাদের সঙ্গে গল্প জুড়লেন। ওনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন, কালকের ট্রেক প্রসঙ্গে ও আরও নানা খুঁটিনাটি বলে দিলেন। নটায় ভাত ,রাজমা,রুটি,অরগানিক সব্জি খেয়ে সোজা লেপের তলায়।কাল ২রা জুন আমাদের যাত্রা শুরু।

২রা জুনঃ খুব ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেল ।পাহাড়ে খুব তাড়াতাড়ি সূর্য উঠে যায়। বিছানা ছেড়ে বাইরে এলাম ।কিছুক্ষন পর আমরা গাড়ি নিয়ে তালুকার দিকে যাত্রা করলাম।এই রাস্তায় সবসময় গাড়ি যায় না।ল্যন্ডস্লাইড হলেই বন্ধ হয়ে যায়।আমারা ভেবেছিলাম হেঁটে যেতে হবে, গাড়ি যাচ্ছে তাই আমাদের ১টা দিন বেঁচে গেল। রাস্তা অবশ্য সেইরকমই ,কতবার যে আমার মাথা ঠুকল, কোমর, পেট ব্যথা হয়ে গেল। কিছুটা রাস্তা ভাল ,বাকিটা বোল্ডার বিছানো। দু-এক বার গাড়ী বন্ধ হল আবার চললো, প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগল তালুকা আসতে। এখানে পৌছেই পেলাম বরফঢাকা সাদা হিমালয়ের দেখা। আকাশ আয়নার মত তকতক করছে আর ঝলমলে রোদ্দুর উঠেছে , সুন্দরী প্রকৃতি যেন আমাদের স্বাগত করছে। এমনিতে জায়গাটা ভীষন অপরিছন্ন। ঘোড়া আর খচ্চর নোংরা করে রেখেছে। gmvn র গেস্টহাউস আছে, কিন্তু তার অবস্থা শোচনীয়। সবাই সীমা গিয়েই রাত্রিবাস করে। সোজা রাস্তা সুপিন নদীর পাশ দিয়ে গেছে, যেন মনে হচ্ছে আমরা নদীর তীর ধরে সোজা উৎসের দিকে এগিয়ে চলেছি। আজ দীর্ঘ ১৪কিমি ট্রেক্ করতে হবে। তাই প্রথম থেকেই পা চালানোর নির্দেশ এল। কিন্তু এপথে হেঁটে শেষ করার জন্যই কি আসা? গন্তব্যে পৌছনোই কি উদ্দেশ্য? আমার মতে তা নয়, প্রকৃ্তিকে কাছ থেকে দেখব, তার রুপ-রস-গন্ধ উপভোগ করব, কখনও যেন পথচলা ক্লান্তিকর না হয়। আমাদের পোর্টার এগিয়ে অনেকদুর চলে গেছে,আমার সাঙ্গীও দ্রুত হাঁটছে। আমি পিছিয়ে পড়ছি। তাড়াহুড়ো না করে আমি নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম, দেখি পাহাড়ের গা বেয়ে জলধারা নেমে আসছে, হাত দিয়ে দেখালাম ভীষন ঠান্ডা জল। জুতো না ভিজিয়ে পার হলাম। এরকম জলধারা পথে আনেক পড়লো। ১ঘন্টা পর রাস্তা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। বোল্ডার বিছনো রাস্তা পেরিয়ে কাঠের পুল পার হলাম,যার নীচ দিয়ে খরস্রতা নদী বয়ে চলেছে। তারপর অনেকটা খাড়া চড়াই পেরিয়ে সমতলে এলাম।এক বিদেশি দম্পতির সঙ্গে আলাপ হল ,অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন হিমালয়ের টানে। ওনারা হর কি দুন থেকে ফিরছেন। বললেন ইন্ডিয়া এত ভাল লাগে যে বারবার আসতে ইচ্ছা করে ,আগে ৪বার এসেছেন। শুনে মনটা বেশ ভাল লাগল। প্রথমদিন ,আর অনভ্যাস তাই বেশ কষ্ট হচ্ছে। তাই ধীরে ধীরে এগিয়ে চল্লাম। মাঝে মাঝে ভিডিও ক্যামেরা চালালাম ,পাখীর কলতান, ঝর্ণা-নদীর পথ আমাদের চলা, নাম না জানা ফুলের বাতাসের সঙ্গে সংলাপ, রঙ্গিন প্রজাপতি ক্যামেরাবন্দি করলাম।আখরোট, পাইন, ওক, চীর, দেওদার, ভুর্জগাছ প্রচুর আছে।তাছাড়া বিরল প্রজাতির হার্বস, ভেষজ উদ্ভিদের জন্য এ অরন্য সংরক্ষিত।সাদা বুনো গোলাপের ঝাড় তো অনেক ,আর তার গন্ধ ও খুব মিষ্টি। এখানে পথে ১টাই গ্রাম পড়ে তাছাড়া কোনও চা খাবার ও জায়গা নেই। তার জন্য এখন ও ৩ কিমি. যেতে হবে। তাই মুখে লজেন্স,চুইংগাম রাখছিলাম। পথে ছোট বাচ্চারা মিঠাই চাইছিল,মানে টফী। আমাদের সঙ্গে যা ছিল ওদের দিলাম, ওদের হাসিমুখের ফটো তুললাম। এদের দেখে ভীষন কষ্ট হলো, পরনে ধুলিধুসরিত জামা, না পায় সঠিক শিক্ষা, না পেট পুরে খেতে।এ কবিংশশতব্দির মানুষ হয়েও কত কিছু থেকে বঞ্চিত। গ্রামের পুরুষরা কাজ করে না, দারু খায় আর মাহিলারা সারাদিন পরিশ্রম করে সংসার চালায়।

আবশেষে চা এর দোকান পাওয়া গেল। নদীর কিনারে কাঠের ১টা ঘর,সুন্দরি যুবতী মিঠা চা খাওয়ালো। দূরে গাঙ্গর গ্রাম দেখা যাচ্ছে।কিছু লজেন্স কিনে রাস্তায় বাচ্চাদের দিতে দিতে গেলাম। একটা সেতু পেরিয়েই আবার কঠিন চড়াই। স্বর্গারোহিনী মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারছে। রোদের তেজ ফিকে হয়ে আসছে। নদীর তীরে এক দল কিশোরকে দেখা গেল। এরা চন্ডীগড়ের ১টি স্কুল থেকে এসেছে। আজ এখানেই এরা এখানেই টেণ্টে থাকবে। আমরাও প্রায় এসে গেছি।বিকাল ৫টা নাগাদ সীমা ফরেস্ট রেস্ট হাউসে এসে পৌছলাম। গরম গরম ম্যাগি ,কফি সোজ়া বিছানায়। ১ ঘন্টা পর অনিন্দ্যর ডাকে ঘুম ভাঙল। সারা শরীর ব্যথায় আড়ষ্ট হয়ে আছে ,কী জানি কাল কি করে হাঁটব? আমাদের পাশের ঘরেই এক বাঙ্গালী এসেছেন একা, তাঁর সঙ্গে আলাপ হল।উনি আমাদের মত নভিশ নন,১মাসের ছুটি নিয়ে বেরিয়েছন।৫৭ বছর বয়স,হিমালয়ের নানা প্রান্তে ঘুরে বেরান।আনেক এক্সপিডিশনে ও যান।চা খেতে খেতে ওনার বেরানোর অনেক গল্প শুনলাম।উনি সঙ্গে রান্নার সামগ্রী নিয়েই এসেছেন।পোর্টার ছেলেটি রান্নাবান্না সব করছে।আমাদের ধাবায় গিয়ে খেতে হল।সেই এক ই খাবার।রুটি,রাজমা, ভাত আর লিংড়ার সব্জি অল্প পরিমানে খেয়ে গরম জলে মুখ হাত ধুয়ে নিলাম।এখানে গ্যাস,কয়লা বা কেরোসিন কিছুই নেই। জঙ্গলের কাঠ জ়্বেলে রান্না করতে হয়। পেন কিলার খেয়ে শুলাম।

৩রা জুনঃ সকালে চা পান করে ,আলুর পরাঠা,আচার প্যাক করে সীমা ছাড়লাম যখন তখন সাড়ে সাতটা বাজে। আজ ও ১২ কিমি হাঁটতে হবে,আর ৮৫০০ফুট উঃ থেকে ১১৫০০ ফুট উঃ চড়তে হবে।আজকেও আকাশ পরিস্কার ,সুন্দর রোদ্দুর উঠেছে। নতুন উদ্যমে আবার যাত্রা শুরু করলাম।আজ কঠিন চড়াই আছে ,কালকের মত জঙ্গলের রাস্তা ও নয়।,সূ্র্যের তাপ সরাসরি মুখে লাগবে।ফরেস্ট রেস্ট হাউস ছেড়ে খানিকটা যেতেই সুপিন নদির ওপর ঝুলন্ত ব্রীজ, এখান থেকে কিছু ছবি তলা হল। তারপরই আধ কিমি সাঙ্ঘাতিক চড়াই, শুধু তাই না, এখানে লুস পাথুর মাটি তাই পা স্লিপ করছে। লাঠির সাহায্যে উঠলাম।বাঁদিকে ওঁসলা গ্রামের রাস্তা গেছে।আমরা সোজা পথ ধরলাম।একটু পরেই জ্যাকেট খুলে ফেলতে হল।বারবার জল তেষ্টা ও পাচ্ছে।অনেক ঝর্না রাস্তায় পড়ছে,জল শেষ হলেই ওই ভরে জিওলিন দিয়ে পান করছি।ঠান্ডা আর স্বাদ ও ভাল।যেতে যেতে এক বিশালাকার ঈগল মূর্হূতের জন্য দেখা দিল।শট নেবার সুযোগ দিল না।তবে সারাক্ষণ পাখির মিষ্টি গান শুনতে পাচ্ছি।নাম না জানা এই পাখির তো আমি প্রেমে পড়ে গেছি,ক্ষনিকের জন্য দেখা দিয়েই লুকিয়ে পড়ছে।অনিন্দ্য অনেক কষ্টে ফোকাস করতে পারল।আজ হাঁটতে আর ও বেশি ভাল লাগছে।সামনেই স্বর্গারোহিনী ,বন্দরপুঞ্ছ হাতছানি দিচ্ছে।আমাদের সেই স্কুল পড়ূয়ার দল ও হেঁটে চলেছে।শর্টকাট রাস্তা দিয়ে যেতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক চড়াই উঠতে হল।তারপরই ভীষন সুন্দর ভ্যালিতে এলাম।কাচের মত স্বচ্ছ নীল আকাশ ,বরফ শৃঙ্গ আর সবুজ গমের ক্ষেত আমাদের জন্য স্বর্গ রচনা করেছে।গম গাছগুলো বাতাসের দোলায় হিন্দোলিত হচ্ছে ,নরম মিঠে রোদ পড়েছে তার ওপর।ক্ষেতের বুক চিরে যে সেই পথেই আবার এগিয়ে চললাম।এবার একটু স্পীড বাড়ালাম।বেশ আনেকটা সমতল দিয়ে হেঁটে গেলাম।এবার কিছুক্ষনের বিরতি।পরাঠা, আচার, মিষ্টি, চানাচুর খেয়ে আবার পথ চলা। এই রাস্তায় বড় গাছ কম। হলুদ, লাল, বেগুনি, আকাশী নানা রংয়ের ছোট-বড় ফুল সবুজ ঘাসে ফুটে আছে, ঠিক যেন এক ঝাঁক প্রজাপতি। এখানে ফুলের বাগান যেন প্রকৃতি নিজেই রচনা করেছে। ফুলের অনেক ছবি তুললাম, ওদের স্পর্শ করলাম না।


দুপুর ১২টা,সূর্যদেব মধ্যগগনে,বারবার জল তেষ্টা পাচ্ছে আর খানিকটা ক্লান্ত হয়েও পড়েছি তখনি ফুলের উপত্যকা থেকে আনেকটা খাড়া পাহাড়ে চড়তে হল।হঠাৎই ঝোড়ো হাওয়া শুরু হল।আবার জ্যাকেট চাপালাম।গা ছমছম করছে,চারদিক শুনশান,নিচে গভীর খাদ।এই জায়গাটি কালকাতিয়া ধার নামে পরিচিত।হার কি দুন নালা,যমদ্বার নালা মিলিত হয়েছে।একটা বড় পাথরে ছোট পাথর সাজিয়ে কারা যেন রেখেছে আর তার ওপর ফুল দিয়ে পুজাও করেছে, আমরাও ফুল দিয়ে প্রণাম করলাম।


এখন ও হাফ রাস্তা বাকি আছে।আর যেতে ইচ্ছা করছে না, এখানেই যদি থাকার জায়গা থাকত ! রোজ়ই ৬/৭ কিমির পর মনের জোরে বাকি পথ যাই।তখন মনে হয় এত কষ্ট করতে কেন বেরোই বাড়ি থেকে?চলার গতি কমে আসছে,ধীরে কিন্তু না থেমে এগিয়ে চলার নীতি অবলম্বন করলাম।জানি একসময় পৌঁছে যাব।তাছাড়া হারিয়ে যাব না বা কোন বিপদের আশঙ্কা নেই।। বড় বড় গাছ দেখতে পাচ্ছি আবার ।একটা সুন্দর ফলস্ এর কাছে একটূ জিরিয়ে নিলাম।আবার চলা ।আলুর পরাঠা অনেকক্ষন হজম হয়ে গেছে,কাজু-কিসমিশ খেয়ে ক্ষিদে ভুলে আছি। এতক্ষন রাস্তা হেঁটেছি কিন্তু কোনো বিপদের মুখে পড়িনি। এই প্রথম আমরা এক বিপজ্জনক স্থানে এসে উপস্থিত। দুরন্ত গতিতে ‘হর কি দুন’ নালা নেমে আসছে ,তার ওপর ৩টে কাঠের গুঁরি এমনি রাখা আছে কোন সাপোর্ট ছাড়া। এটা ক্রস করে ওপারে আমাদের যেতে হবে। পা পিছলে গেলেই সলিল সমাধি। চমনের হাত ধরে ২ জনে পার হলাম মৃত্যুফাঁদ। খরস্রোতা নদীর পাশ দিয়ে খানিকটা যাওয়ার পর ঘাসের মাঠ পার হলাম। তখনি দূর থেকে টেন্ট দেখতে পেলাম। শরীর যতই ক্লান্ত থাক,আমার তো দু হাত তুলে নাচতে ইচ্ছা করছে। উফফ এ আমি কোথায় এলাম! স্বপ্ন দেখছি না কি! অসাধারন সুন্দর সেট আপ।মনে মনে অনেক ধন্যবাদ জানালাম অনিন্দ্যকে।সত্যি ভ্যলি অফ গডস্।দুর থেকে দেখা পিকগুলো এখন যেন হাতের নাগালে।উপত্যকা অনেকটা দোলনার মত ঝুলে আছে যেন।থাকার জন্য ফরেস্ট রেস্ট হাউস আর gmvn র বাংলো আছে।আমরা ফরেস্টেই উঠলাম।কিন্তু খাবার ব্যবস্থা নেই,রেশন নিচে থেকে আনাতে পারেনি তাই .........


আমাদের সঙ্গে কটা বিস্কুট আর ১প্যকেট ম্যগি আছে।ক্ষিদেতে পেট তখন জ্বলছে।চা পানের নিমন্ত্রন করেছিলেন চন্ডীগড়ের স্কুলের মাস্টারমশাই। আমরা বিকালের চা ও রাতের ডিনার ওনাদের সঙ্গেই করলাম।সেদিন ওনার এই উপকার ও আন্তরিকতা এক পরম প্রাপ্তি।ফরেস্ট বাংলো থেকে ভ্যালিটাকে চমৎকার লাগছিল। দরজা খুলেই স্বর্গারোহিনী পিক্,যমদ্বার গ্লেসিয়ার।যমদ্বার নালা থেকে যমদ্বার নালার উৎপত্তি।এখান থেকে ৪/৫ কিমি ট্রেক করে যেতে হয়,গ্লেসিয়ার ।তবে গ্লোবাল ওয়ার্মিয়ের জন্য আর দূরে চলে গেছে তাই ৯ কিমি গেলে তবেই গ্লেসিয়ার দেখতে পাওয়া জাবে।আমরা তাই যমদ্বার যাবার প্ল্যন বাতিল করলাম।এই ভ্যালির সৌন্দর্য্য পাগল করে দিচ্ছে।এখানেই ২দিন কাটাব।চন্দ্রালোকে গোটা ভ্যলি প্লাবিত।নির্মেঘ আকাশ, বরফের মুকুট পরা পাহাড় ,নদীর জলে চাঁদের প্রতিফলন যা এতদিন স্বপ্নে দেখতাম তাই আজ দেখছি।এত ভাল আবহাওয়া এর আগে কোনদিন পাইনি।মনের ইচ্ছা এভাবে ভগবান পুরন করবেন এতটা আশা করিনি।জাঁকিয়ে ঠান্ডা পরছে।ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছিল না ।ঘরে ফিরেও দেখি চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে।


৪ঠা জুনঃআজ আমরা যাব মারিন্দা তাল।৩কিমি হেঁটে যেতে হবে।সকালেও টেন্টে ব্রেকফাস্ট করার নিমন্ত্রন ছিল কিন্তু আমরা আর যাইনি ,ম্যাগি খেয়ে ,বাকিটা প্যক করে সঙ্গে নিয়ে সারে আটটা নাগাদ বেরলাম।প্রায় পুরোটাই চড়াই।যত এগোচ্ছি হাঁটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পাথর ,বোল্ডারের ওপর দিয়ে যাচ্ছি।হাল্কা বেগুনি বর্নের রডোড্রেনডন দেখতে পেলাম।শেষ আধ কিমি রাস্তায় কোন সবুজের চিহ্ন নেই,ভীষন ড্রাই।শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।পৌছবার পর সব কষ্ট গায়েব।তালের স্বচ্ছ জলের দিকে তাকিয়ে অনেকটা সময় কাটল।মারিন্দা তাল থেকে হার কি দুন নালার জন্ম।মারিন্দা ছাড়িয়ে পর্বতপ্রেমীরা বরাসু পাস ক্রস করে হিমাচলে প্রবেশ করে। ‘সীমায়’ একদল বাঙ্গালী যুবকের আলাপ ,তারা যাচ্ছে এপথে।


আজ আমাদের ফেরার কোন তাড়া নেই। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে ৩ঘন্টা কেটে গেল। শুভ্র পাহাড়চুড়া ,মেঘেদের লুকোচুরি দেখতে দেখতে যেন হারিয়ে গেলাম। বরফের ওপর দিয়ে হাঁটা হল,ছুঁড়ে খেলা ও হল। দুপুরে ফিরে লাঞ্চ করে বিশ্রাম।

৫ই জুনঃহর কি দুন থেকে আজ আমরা বিদায় নেব।ছবির মত সুন্দর ভ্যলি ছেড়ে একই রাস্তা ধরে সীমা এলাম দুপুর ২টো।আকাশ মেঘ করে কিছুক্ষনের মধ্যেই খুব জো্রে বৃষ্টি নামল।আজ সকাল এ ঘুম থেকে উঠেই দেখি দূরের পাহাড়গুলো বেশী সাদা দেখাচ্ছে আর নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা বেড়ে গেছে যেন। একেই বলে প্রকৃতির খেয়াল।আমরা তিনদিন খুব ভাল আকাশ পেলাম ,দারুন দেখলাম ,মন ভরে গেছে কষ্ট সার্থক হয়েছে।পাহাড়ের বৃষ্টি থেমেও যায় তারাতারি।না হলে কাল কপালে দুঃখ আছে।

৬ইজুনঃসকালে উঠে দেখলাম আকাশ পরিস্কার ,তবে মেঘ আছে,পরে বৃষ্টির সম্ভবনা আছে।আমাদের আজকেই সাঁকরি পৌছতে হবে।পুরলা এলাম দেড়টা নাগাদ,ওখানে লাঞ্চ করে আবার হাঁটা,কারন জীপ কিছুক্ষন আগে চলে গেছে।৭ কিমি যাবার পর বাকি রাস্তা জীপে এলাম।


৭ই জুনঃ আজ সকালে দেরাদুন এর বাসে উঠেছি।দেরাদুন থেকে রাতের বাসে মথুরা।আবার দৈনন্দিন ব্যস্ততা কাল থেকে শুরু ।অবসরে এই লেখা পড়ব আর ভিডিও দেখব।কিছুদিন পরেই আবার হিমালয়ের ডাকে সাড়া দেব ,বেড়িয়ে পড়ব এভাবেই।


কিছু জরুরি তথ্য
১। দেরাদুন থেকে গাড়ি বুক করে নেওয়া যায়,অথবা বাস যাচ্ছে সাঁকরি।সকাল ৬টা,৮টা।ব্রেক দিয়ে পুরলা থেকে ও আবার যাওয়া যায়।

২। সাঁকরি তে গাড়োয়াল মান্ডল বিকাশ নিগম এর বাংলো আছে ব্যবস্থা বেশ ভাল।বাকি সব জায়গায় গা ম বি নি ও ফরেস্ট রেস্ট হাউস আছে।তবে টেন্ট ও রেশন নিয়ে এখানে যাওয়াই ভাল।

৩।সঙ্গে শুকনো খাবার ,গ্লুকোজ,ওষুধ ,জিওলিন নিয়ে যেতে হবে।জল ফুটিয়ে/জিওলিন না দিয়ে পান করা যাবে না।

৪।সঙ্গে যথেষ্ট উলেন কাপড়, রেনকোট রাখতে হবে ।

৫।টর্চ, মোমবাতি, ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জড করা থাকে যেন।

আমি ঝুমা মুখার্জী,বর্তমানে হলদি নদির তিরে ছোট টাউনশিপে থাকি আমার মেয়ে আর হাসব্যান্ডের সঙ্গপাহাড় ,নদি ,জংগল আমায় ভিষন টানে তাই মঝে মাঝেই স্যক নিয়ে বেরিয়ে পরিতাছারা নতুন নতুন রান্না করা ,বই পরা ,গান শোনা ,একটু আধটূ লেখালিখি আমার নেশানিজের সম্পর্কে আর কিছু বলার নেই








এই সংখ্যার অন্যান্য ভ্রমণের গল্প :


অরণ্যের ক'দিন

ইয়েলোস্টোন

হিমাচলে হারিয়ে যাওয়া

3 comments:

  1. bhromonkahini lekhay Jhuma tumi sorbodai siddhohosto, ebareo Valley of the Gods nirash koreni pathokke, sange durdanto sob chhobi.. sob miliye darun ekta prapti.

    ReplyDelete
  2. Jhuma, ager blog eo tomar lekha darun, ebareo... porte khub bhalo laglo

    ReplyDelete
  3. khub bhalo laglo poRe....jabar ichchhe roilo tobe otota hantte parbo ki?:P

    ReplyDelete