Wednesday, September 2, 2009

শেষ অঙ্ক


হটাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল প্রিয়ার। নিকষ অন্ধকারে দমটাযেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওর। আজকাল প্রায়ই ওর এমন হচ্ছে। তাড়াতাড়ি বিছানার মধ্যে উঠে বসল ও। মাথার ভেতরটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। খানিক্ষণ চুপ করে বসে রইল। আর বসে বসে সেই চিঠির কথা গুলো আবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল ওর। যেদিন থেকে ওই চিঠি ওর চোখে পড়েছে প্রিয়ার চোখের ঘুম এইভাবেই যেন কোথাও উধাও হয়ে গেছে। কিছুতেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারছেনা ও। আজও একই ভাবে সেই দম বন্ধ হয়ে ওর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ৩টে বাজছে। আস্তে আস্তে উঠে পড়ল প্রিয়া বিছানা থেকে। খোলা জানলাটার কাছে গিয়ে চুপ করে দাঁড়াল খানিক্ষণ। মনের ভেতর সেই একরকম তোলপাড় চলছে ওর। কেন এমন হচ্ছে বারে বারে। কেন নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না ও। কেন ভুলতে পারছে না চিঠির কথা ও।
অনেক ছোট বেলায় প্রিয়ার বাবা মারা গিয়েছিলেন। প্রিয়ার তখন বয়স ৮ বছর। এরপর পেরিয়ে গেছে ১৭টা বছর। আজ এতদিন পরেও সেই দিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে প্রিয়ার। বাবার বড় আদরের মেয়ে ছিল সে। সব আবদার চাহিদা বাবার কাছেই ছিল তার। কিন্তু কি যে হয়ে গেল! বাবা একদিন সেই যে অফিসে গেলেন আর ফিরলেন না । ফিরে এল শুধু বাবার নিষ্প্রাণ দেহটা। অফিসেই হটাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে বাবা কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিলেন। চিকিৎসা করার কোন সু্যোগই দেননি। ঠিক কি যে হয়েছিল, ব্যাপারটা বুঝে উঠতেও পারেনি ওই সময় প্রিয়া। শুধু দেখেছিল তার মা কেমন যেন পাথরের মতো বাবার দেহটার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। মা বাবার সম্পর্কটা যতটুকু প্রিয়ার মনে পড়ে খুবই সুন্দর ছিল। তবে তার মা বরাবরই খুব শান্ত এবং চুপচাপ প্রকৃতির সে দেখে এসেছে। বরং তার বাবা মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল রকমের। সব সময় মুখে হাসি আর সকলের ভীষন প্রিয় এক মানুষ। তাই বাবা চলে যেতে প্রচুর মানুষ তাদের মনের বেদনা ব্যক্ত করেছিলেন। এরপর প্রিয়ার মা রজনী, অনেক কষ্ট করে শ্বশুরবাড়িতে দিনের পর দিন মুখ বুজে নানা গঞ্জনা সহ্য করে তিল তিল করে প্রিয়াকে মানুষ করে তুলেছিলেন। পুরনো আমলের উত্তর কলকাতার রক্ষনশীল যৌথ পরিবারে সেই সময় মেয়েদের চাকরি করা রীতিমত সাহসী পদক্ষেপ ছিল। রজনী কিন্তু সমস্ত গঞ্জনা সহ্য করেও শুধু প্রিয়াকে যাতে মনের মত করে মানুষ করে তুলতে পারেন সেই কথা ভেবে চাকরি করতেও পিছুপা হননি। প্রিয়া মাঝে মাঝে ভাবে যে মায়ের মত এত শান্ত সাধারণ মুখচোরা মানুষ কিভাবে ওই সময় এমন মনের জোর দেখিয়েছিলেন। মায়ের চাকরি করা নিয়ে প্রিয়া বড় হবার পরেও তাদের পরিবারের জেঠিমা কাকিমাদের মায়ের প্রতি দূর্ব্যবহার নিজের চোখে দেখেছে। যেহেতু তারা বাড়িতে থাকতেন আর রজনী চাকরি করতে বেরোতেন জেঠিমা কাকিমারা কিছুতেই সেটা সহ্য করে উঠতে পারতেন না। অথচ অফিস থেকে ফিরে প্রিয়া কখনও মাকে বসে থাকতে দেখেনি। অফিস থেকে বাড়ি ফিরেই জামা কাপড় ছেড়ে দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকতেন রজনী। ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যাঠা কাকার ফরমাশ মত জলখাবার বানিয়ে মুখের কাছে ধরতেন। প্রিয়া অধীর আগ্রহে বই খাতা নিয়ে পড়তে পড়তে পথ চেয়ে বসে থাকত কখন সে একটু মায়ের দেখা পাবে, একটু আদর পাবে মায়ের। শুধু রাতে ঘুমবার সময় টুকু রজনী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করতেন সারা দিনের কষ্ট দুঃখ এই সময়টাতেই রজনী সব কিছু ভুলে শুধু মেয়েকে বুকে জড়িয়ে আদরে সোহাগে ভরিয়ে দিতেন। প্রিয়ার কাছে রাতের ওই সময়টা ছিল সব থেকে ভাললাগার সময়। সারা দিন শুধু অই সময় টার জন্যে প্রিয়া অপেক্ষা করে থাকত। এইভাবেই প্রিয়া ধীরে ধীরে কখন বড় হয়ে উঠেছিল। রজনীর একান্ত প্রচেষ্টায় প্রিয়া আস্তে আস্তে স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে গিয়েছিল। যেখানে তাদের পরিবারের বাকি সব মেয়েদের ২০-২২ বছর বয়েসেই বিয়ের পিড়ি গন্তব্য ছিল সেখানে শুধু রজনীর জেদেই প্রিয়া P.H.D করে উঠতে পেরেছিল। এমন মায়ের প্রতি সন্তান হিসাবে যে কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা থাকা উচিৎ প্রিয়ারও ঠিক ততটাই তার মায়ের প্রতি ভালবাসা ও সম্মান রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে রজনী খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন। গলায় দিনের পর দিন খুব ব্যথা হচ্ছিল অথচ কিছুতেই ডাক্তারের কাছে প্রিয়া হাজার বার বলা সত্ত্বেও রজনী যেতে চাননি। এরম ভাবে যেদিন গলার স্বরটি একেবারে বন্ধ হয়ে গেল প্রিয়া জোর করে যখন ডাক্তারের কাছে মাকে নিয়ে গেল ডাক্তার সব পরীক্ষা করে জানালেন বড্ড দেরি হয়ে গেছে আর কিছু করা সম্ভব নয় রজনীর গলায় ক্যান্সার দানা বেঁধেছে। সেদিন প্রিয়ার নিজেকে সত্যি সত্যি অনাথ মনে হয়েছিল। বাবা কি জিনিষ প্রিয়া ভুলেই গিয়েছিল প্রায় মাই তার জীবনে সব কিছু ভরিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু মায়ের এই অসুখ প্রিয়া কে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিল যেন। তবুও সব আশা শেষ হয়ে গেলেও প্রিয়া আশা ছাড়তে পারেনি সব ডাক্তারদের দোরে দোরে ঘুরছিল যদি কোনভাবে সে তার মাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। মায়ের প্রতি প্রিয়ার এই ভালবাসা সম্মান নির্ভরশীলতার কিন্তু হঠাৎ একদিন ভাঁটা পড়ে গেল।
কিছুদিন আগে অনেক পুরনো দিনের কিছু বই খাতা আলমারি থেকে বের করে দেখতে দেখতে প্রিয়া একটি চিঠি খুঁজে পায় একটি বইয়ের ভেতর থেকে। চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে পড়তে প্রিয়া যেন নিজেকেই নিজে হারিয়ে ফেলে। এ কি দেখছে সে!! এ কার চিঠি!! তার মাকে উদ্দেশ্য করে এমন চিঠি কে দিয়েছে!! ঘৃনায় প্রিয়া যেন কেমন কুঁকড়ে যায়। যে মাকে প্রিয়া এতদিন দেবীর মত পূজো করে এসেছে সে এমন কি করে হতে পারে?? প্রিয়া নিজের কাছে হাজার প্রশ্ন করেও এর কোন উত্তর খুঁজে পায় না। কিন্তু প্রিয়ার ইচ্ছেও করে না যে এই চিঠির ব্যাপারে রজনীকে গিয়ে কোন প্রশ্ন করতে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজের মন থেকে চিঠির ব্যাপারটা সরিয়ে দিতে কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠে না। যে মায়ের সাথে প্রিয়া কখনো উঁচু গলায় কথা বলেনি সেই মায়ের ওপরেই আজকাল প্রিয়া বুঝতে পারেনা কেন কারণে অকারণে এত রাগ হয়। কিছুতেই প্রিয়া রজনীর সাথে ভাল ভাবে কথা বলতে পারেনা আর।
জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত সব কথা মাঝ রাতে প্রিয়ার মনে পড়ছিল। যেদিন থেকে ওই চিঠি পেয়েছে তারপর থেকেই প্রিয়া রাতে ঘুমোতে গেলেই ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে আর দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওর। বার বার প্রিয়া চেষ্টা করছে মন থেকে এই ব্যাপারটাকে সরিয়ে দিতে কিন্তু কিছুতেই পারছেনা সে। বার বার মনকে সে বোঝাচ্ছে যে মৃত্যুসজ্জায় শায়িত মাকে সে দুঃখ দেবেনা কিন্তু কিছুতেই ও পারছেনা সেটা মনে রাখতে। আজ সে দুপুর বেলায় রজনীর প্রতি অকারণেই দূর্ব্যবহার করেছে।
দুপুর বেলা খেতে গিয়ে রজনী আজ কিছুতেই খেতে পারছিলেন না গলায় ব্যথাটা দিনে দিনে আরও বেড়ে যাচ্ছে। আজকাল শক্ত আর কোন জিনিসই রজনী খেতে পারেন না। সেটা প্রিয়া জানা সত্ত্বেও দুপুরে রজনীর সঙ্গে অসম্ভব খারাপ ব্যবহার করে খাওয়া নিয়ে। রজনীও বেশ অবাক হয়েছেন মেয়ের হটাৎ এইরম পরিবর্তন দেখে। কিছুতেই তিনি বুঝে উঠতে পারছেনা কেন তার এত আদরের মেয়ের এই পরিবর্তন। প্রথম প্রথম রজনী ভাবছিলেন হয়ত তার শরীরের এমন অবস্থা দেখে মেয়ে মানসিক ভাবে খুব ভেঙ্গে পরেছে তাই এমন ব্যবহার করছে। কিন্তু দিনে দিনে রজনী বুঝতে পারছেন শুধু মাত্র তার অসুস্থতার কারণে প্রিয়ার এমন পরিবর্তন ঘটেনি। অবশ্যই অন্য কিছু ঘটেছে ওর জীবনে। কিন্তু বরাবরি চুপচাপ রজনী মেয়েকে কিছুতেই মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেন না যে প্রিয়ার মনে কি হয়েছে, কেন সে এমন ব্যবহার করছে। যত জীবনের শেষ দিন ঘনিয়ে আসছে রজনী ততই মেয়ের ওপর অভিমান জমাট বেঁধে উঠছে। রজনী এমনিতে কোনদিনই প্রিয়ার জীবনের কোন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেননি। বরাবরি প্রিয়া তার জীবনের সমস্ত সিদ্ধান্ত নিজে নিজেই নিয়ে এসেছে। রজনী সে ব্যাপারে মেয়েকে অসম্ভব স্বাধীনতা দিয়ে এসেছেন। অন্য দিকে প্রিয়াও কখনও তার মায়ের দেওয়া সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার করেনি। ওর জীবনে যখন যা ঘটেছে প্রিয়া সবার আগে সেই সব ঘটনা তার মায়ের সঙ্গে সে ভাগ করেছে। রজনী যদি দরকার মনে করেছেন প্রিয়া কে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন নাহলে চুপ করেই থেকেছেন। মেয়ের ওপর রজনীর অগাধ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রিয়ার ব্যবহার দেখে রজনী কিছুতেই বুঝতে পারছেন না ঠিক কি ঘটেছে। কেন প্রিয়া এমন করছে তার সঙ্গে। প্রতি মূহুর্তেই রজনী ভাবছেন এই বুঝি প্রিয়া তাকে কিছু বলবে মৃত্যুর আগে অন্ত্যত মেয়ের মনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করার চেষ্টা করবেন রজনী। কিন্তু না দিনের পর দিন রজনীর অপেক্ষাই সার হয়। প্রিয়া মুখে কিছুই বলেনা তাকে। অথচ সে যে রজনীর ওপর ভীষন বিরক্ত সেটা বার বার রজনী অনুভব করতে পারেন।
খোলা জানলার দিকে মাঝ রাতে প্রিয়া বাইরের নিকষ অন্ধকারে চেয়ে থেকে ভাবে কেন তার জীবনে এমন এক সন্ধিক্ষন এল?? কেন তার চোখে ওই চিঠিটি পড়ল। কি দরকার ছিল ভগবানের এমন অবিচার করবার তার সঙ্গে। মায়ের মৃত্যুর আগে তার দেবীর মত মাকে কেন ঠাকুর এমন করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেন। রজনীর মত মানুষ সারা জীবন যেখানে এত দঃখ পেয়েছেন তখন জীবনের শেষ কটা দিন কেন ভগবান প্রিয়ার জীবনে সব কিছু বদলে দিয়ে গেলেন। প্রিয়া অনেক চেষ্টা করেও ঘটনাটিকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেনা। অথচ তার এমন সাহসও হচ্ছেনা যে সে সোজাসুজি রজনী কে চিঠিটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। মৃত্যু পথযাত্রী মাকে এই প্রশ্ন করলে তার কিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে প্রিয়া কিছুই বুঝতে পারেনা। শুধু মনের ভেতর এক অসম্ভব চাপা কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে।
চিঠিটির প্রত্যেকটি বর্ণ প্রতি মুহূর্তে প্রিয়ার মনে পড়ে। তাও আবার আলামারি খুলে প্রিয়া চিঠিটি পড়তে থাকে।

প্রিয়তমা রজনী,
তোমার স্বামীর মৃত্যুর খবর পেলাম। খুবই দঃখজনক ঘটনা। শুনে মনটা খুবই খারাপ লাগছে। তুমি এইরম বিপদের সময় কি করছ জানিনা। যে কথা তোমাকে ১০ বছর আগে বলে উঠতে পারিনি আজ সেই কথাই বলবার জন্যে এই চিঠি লিখছি। আমি আজও তোমার পথ চেয়ে বসে আছি রজনী। আজ আর তোমার জীবনে পুরনো কোন বাধা নেই। তুমি কি পার না আমার জীবনে একটি বার ফিরে আসতে। আমি তোমার মেয়ের সব ভার নিতে রাজী আছি তার বদলে শুধু তোমাকে ফিরে পেতে চাই। দয়া করে আমার এই অনুরোধটুকু রাখো। যে সাহস তোমাকে ১০ বছর আগে দেখাতে পারিনি আজ সেই সাহস দেখিয়ে ফেললাম, জানিনা এর ফল কি হবে?? তোমার ইতিবাচক উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।
তোমার শুধু তোমার সুকোমল।

বারবার চিঠিটা প্রিয়া পড়তে থাকে আর তার দুই চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল বের হতে থাকে। প্রিয়ার মনে খালি একটাই প্রশ্ন......কে এই সুকোমল??? কি করে জানতে পারবে প্রিয়া এই মানুষটির ব্যাপারে?? মায়ের সাথে এই লোকটির কিসের সম্পর্ক ছিল?? না কোন উত্তর নেই প্রিয়ার কাছে। কি করে মাকে জিজ্ঞেস করবে প্রিয়া? কিছুতেই পারবেনা সে এর উত্তর তার মায়ের থেকে চাইতে। কিন্তু যতক্ষণ না এই প্রশ্নের উত্তর প্রিয়া পাচ্ছে সে যে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেনা। প্রিয়া চায়না মৃত্যুর আগে মায়ের প্রতি তার কোন রকম বিরূপ ধারণা থাকুক। তার দেবীর মত মাকে সে যেমন সারা জীবন দেখে এসেছে সেই ছবিটাই তার মনে সে রেখে দিতে চায়।
কিন্তু দিন যায়। রজনী ধীরে ধীরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। মেয়ের প্রতি খানিকটা অভিমানেই রজনীর মনে হয় যত তাড়াতাড়ি সে চলে যেতে পারে ততই যেন তার শান্তি হয়। প্রিয়াও পারেনা মাকে সব কথা খুলে বলতে। একদিন প্রিয়া ঘরে নেই রজনী বহু কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে প্রিয়ার ঘরের দিকে পা বাড়ায়। সে আজ মরিয়া হয়ে ওঠে। যেমন করেই হোক আজ তাকে জানতেই হবে তার মেয়ের মনের কথা। নাহলে মরেও রজনী শান্তি পাবেনা কিছুতেই। এক পা এক পা করে এগিয়ে প্রিয়ার ঘরে এটা সেটা হাতড়াতে থাকে রজনী। বই খাতা সব উলটিয়ে পালটিয়ে খুঁজতে থাকে যদি কিছু খুঁজে পায় যাতে কিছু আন্দাজ করতে পারে সে। হটাৎ সামনে প্রিয়ার ডাইরিটি চোখে পড়ে রজনীর। ছোঁ মেরে তুলে নেই সেটি। পাতার পর পাতা ওলটাতে থাকে রজনী। হঠাৎ এক জায়গায় এসে চোখ আটকে যায় ওর। কি দেখছে সে!! নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেনা রজনী। কোথা থেকে এই চিঠি খুঁজে পেল প্রিয়া!! হায় ভগবান...আজ তার সব প্রশ্নের জবাব রজনী পেয়ে গেছে। প্রিয়ার মনে কিসের দন্দ্ব আজ সে সব বুঝতে পারছে। ভগবান কেন এমন করলেন?? কেন তাকে তার মেয়ের চোখে এমন করে ছোট করে দিলেন। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিতে থাকেন রজনী। কেন সে চিঠিটাকে যত্ন করে তুলে রেখেছিল?? কেন সে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে এই চিঠি রাস্তায় ফেলে দেয়নি। চোখের সামনে যেন সব ঝাপসা হয়ে যায় রজনীর। কোন রকমে টলতে টলতে বিছানায় গিয়ে বসে পড়ে সে। এ কি হল ওর জীবনে। সে তো জীবনের শেষ কিনারাতে দাঁড়িয়েই ছিল কেন এমন হয়ে গেল। কিছুতেই ভেবে পায়না রজনী কি করবে কি করে মেয়ের মুখোমুখি সে দাঁড়াবে?? মেয়েকে কি বলবে ও? না কোন উত্তর খুঁজে পায়না রজনী। শেষে আর কোন রাস্তা না পেয়ে খাতা পেন নিয়ে বসে একটি চিঠি লিখবে বলে। কাঁপা কাঁপা হাতে কোন রকমে লিখতে চেষ্টা করে রজনী। নামটা চিঠির ওপরে লিখতে গিয়ে হোঁচট খায় আবার। কিন্তু না, এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তার হাতে আর একদম সময় নেই। যেমন করেই হোক মেয়ের প্রশ্নের উত্তর ওকে দিতেই হবে। যে চিঠির উত্তর সে কোন দিনই দিত না আজ সেই মানুষটিকেই সে চিঠি লিখে সব কিছু জানাবে। তাকেই বলবে এই সমস্যা থেকে উদ্ধার করতে। সমস্ত লজ্জাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে আজ রজনী তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষ টিকে চিঠি লিখতে বসেছে, যে কিনা জীবনের কোন এক সময় মনের অনেকটা অংশ জুড়ে বসেছিল। চিঠি লিখতে গিয়ে বার বার হাত কেঁপে উঠছিল রজনীর। তবু তাকে আজ লিখতেই হবে জানাতেই হবে সব কিছু সেই মানুষটিকে। রজনী লিখতে থাকে,

সুকোমল,
আজ বহু যুগ পরে বাধ্য হয়ে তোমাকে লিখতে বসেছি। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি আমি এখন। কিন্তু যাবার আগে আজ তোমাকে সত্যি আমার বড় দরকার। তোমার চিঠির তখন কোন উত্তর আমি দিইনি কিন্তু কেন জানিনা সেই চিঠিটা ফেলেও দিতে পারিনি আর তার সেই খেসারত আজ যাবার আগে আমাকে দিতে হচ্ছে। ওই চিঠি আমার প্রাণের থেকেও প্রিয় আমার মেয়ে প্রিয়ার হাতে পড়েছে আর তারপর থেকেই প্রিয়ার আমার প্রতি ব্যবহার অস্বাভাবিক ভাবে বদলে গেছে। কিন্তু প্রিয়া আমাকে নিজে থেকে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। বোধহয় মায়ের কাছে জবাব চাইতে লজ্জা পেয়েছে। আমি নিজে মুখে ওকে কিছুতেই কিছু বলে উঠতে পারব না। তাই আজ আমার তোমাকে দরকার পড়েছে। তুমি এসে আমাকে এই লজ্জার হাত থেকে উদ্ধার করো। আমার হাতে বড় কম সময় রয়েছে তাই খুব তাড়াতাড়ি। তোমার অপেক্ষায় রইলাম।
রজনী।

চিঠি লেখা শেষ করে রজনী খুব তাড়াতাড়ি বাড়ির কাজের মেয়ে কে ডেকে তার হাতে চিঠিটি দিয়ে পোস্ট করে দিতে বললেন।
আজ প্রিয়া বাড়ি ফিরে দেখল রজনী যেন আরও বেশি ঝিমিয়ে পড়েছেন। ডাক্তারকে ফোন করে জানাতে ডাক্তার আর দেরি না করে রজনীকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে নির্দেশ দিলেন। প্রিয়া আর দেরি না করে রজনীকে নিয়ে গিয়ে হাসপাতেলে ভর্তি করিয়ে দিল। ডাক্তার এসে দেখে আর তেমন কোন ভরসা দিতে পারলেন না। জানালেন সময় আর বেশি নেই। রজনী বহু কষ্টে হাত নেড়ে প্রিয়াকে কাছে ডাকলেন। শূন্য দৃষ্টিতে প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। প্রিয়ার গলার কাছে কান্না যেন দলা পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছিল। আজ তার প্রানের থেকেও প্রিয় মা তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে অথচ প্রিয়ার মনে আজ মায়ের ওপর কেন এত ঘৃনা প্রিয়া কিছুতেই বুঝতে পারছেনা। অনেক চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখবার ও, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেনা। রজনী কিছু বলবার চেষ্টা করলেন কিন্তু গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হল না। শুধু মুখটাই একটু নড়ে উঠল। প্রিয়া আর সহ্য করতে পারল না। ঝাপিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল...বলে উঠল “মা আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও মা...আমি তোমাকে ঘৃনা করেছি। তোমার এত দিনের সব ভালবাসা কষ্ট আমি ভুলে গিয়ে তোমাকে আমি দূরে সরিয়ে দিয়েছি মা......মা তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না মা।“ প্রিয়ার চোখের সামনে যেন সব অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। রজনী কিছু বলবার চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারলেন না। শুধু তার ঠোঁট দুটো নড়তে লাগল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই রজনীর দেহটা নিথর হয়ে গেল। প্রিয়া নির্বাক শূন্য দৃষ্টিতে মায়ের নিষ্প্রাণ দেহটার দিকে চেয়ে রইল। খানিক্ষণের মধ্যে আত্মীয় স্বজন খবর পেয়ে এসে গেলেন। রজনীর দেহটা এম্বুলেন্সে উঠিয়ে নিয়ে চলে যাওয়া হল।
প্রিয়ার কাছে আজ যেন সব কিছুই বড় ধূসর লাগতে শুরু করেছে। প্রিয়া বুঝতে পারছেনা ওর জীবনে ঠিক কি ঘটে গেল আজকে। ওর জীবনের সব থেকে কাছের মানুষ টি আজ চিরকালের মত তাকে ছেড়ে চলে গেছে কোন এক অজানা দেশে অথচ প্রিয়ার মনে আজ এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি মাকে হারানর জন্যে। এক দিকে যেমন দুঃখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে অন্য দিকে থেকে থেকেই এখনও সেই চিঠির কথাগুলো প্রিয়াকে নাড়া দিচ্ছে। সে জানতে পারল না মায়ের কাছ থেকে সেই মানুষটির কথা। যে কথা হয়ত আজ থেকে সারা জীবন প্রিয়াকে নাড়া দিয়ে যাবে। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি তে প্রিয়াকে কখনও পড়তে হবে প্রিয়া সেটা কখনই ভাবতে পারেনি। তার প্রাণের প্রিয় মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার জীবন আজকে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গেছে। এই বিশাল পৃথিবীতে আজ সে পুরোপুরি একা হয়ে গেল কিন্তু মনের কোণায় কোণায় মায়ের জন্যে আজ কেন এমন বিদ্বেষ ভরে রয়েছে। কেন এক সামান্য চিঠি তার মায়ের এত দিনের সাধনা কে ছারখার করে দিয়ে চলে গেল কিছুই বুঝতে পারছেনা প্রিয়া। নিজেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করছে ও।
মায়ের নিথর দেহের সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়া। মায়ের মুখাগ্নি করতে হবে তাকে। প্রিয়ার দু চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল বয়ে চলেছে। প্রিয়া কিছুতেই ক্ষমা করে উঠতে পারছেনা আজ নিজেকে। তার মা কোন দিন তার প্রতি কোন কর্তব্যে অবহেলা করেননি সে যা চেয়েছে তার মা সাধ্যের বাইরে গিয়ে তা তাকে দিয়েছেন তবু, তবু কেন আজ মায়ের চলে যাবার পরেও মায়ের প্রতি সম্পূর্ন শ্রদ্ধা ভালবাসা সে উজাড় করে দিতে পারছেনা। এই দুঃখ প্রিয়া কে চিরটা কাল বয়ে বেড়াতে হবে এখন থেকে। কোন রকমে মায়ের মুখাগ্নি করে প্রিয়া দু চোখ বন্ধ করে ছুটতে শুরু করল। কোন দিকে আজ তার কিছুই খেয়াল নেই। বাড়ি তে ঢুকে তার মনে হল সারা পৃথিবী যেন তার চোখের সামনে বন্‌বন্‌ করে ঘুরে চলেছে। বিছানায় শুয়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে প্রিয়া। কিন্তু আজ তার কান্না থামানোর বা তার কষ্টে মাথায় এসে হাত বুলিয়ে দেবার কেউ আর নেই। বুকের ভেতর টা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে প্রিয়ার। ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে সে।
আজ এক সপ্তাহ কেটে গেছে রজনী চলে গেছে। প্রিয়া সব কিছু ছেড়ে যেন কেমন বোবার মত আনমনা হয়ে বাড়িতেই বসে রয়েছে কটা দিন। সারাক্ষন শুধু নানা রকম কথা ভেবে চলেছে ও। হটাৎ কাজের মেয়েটি এসে জানাল যে কোন এক ভদ্রলোক তার সাথে দেখা করতে এসেছেন। প্রিয়া খুব অবাক হল শুনে। এমন সময় কে এল তার সাথে দেখা করতে?? প্রিয়া পায়ে পায়ে দরজার দিকে এগোল। দরজার কাছে গিয়ে দেখল এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। প্রিয়া বিস্মিত হল। কে ইনি! প্রিয়া তো এনাকে চেনে না। কখনও তো প্রিয়া এই মানুষটিকে দেখেনি। দরজার কাছে গিয়ে প্রিয়া জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ভদ্রলোকটির দিকে চাইল। প্রৌঢ় মানুষটি একটু অপ্রস্তুত হয়ে প্রিয়ার সামনে হাত জোড় করে জানাল ...... “আমার নাম সুকোমল”। চমকে উঠল প্রিয়া। পরক্ষনেই ঘৃনা আর বিদ্বেষে প্রিয়ার শরীরটা যেন কেমন বিকৃত হয়ে উঠল। কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল লোকটির দিকে জিজ্ঞেস করল....”কি চাই এখানে আপনার”? ইতস্তত করে সুকোমল বললেন, “একটু ভেতরে আসতে পারি আমি? কিছু কথা ছিল।” প্রিয়ার রাগে শরীর যেন অবশ হয়ে যাচ্ছিল এই মানুষটিকে দেখে। এই লোকটার জন্যেই সে তার মাকে কষ্ট দিয়েছে সে তার মাকে ঘৃনা করেছে মৃত্যুর আগে সে তার মাকে এতটুকু সহানুভূতিও দেখায়নি। এই মানুষটির সাথে কথা বলতেও প্রিয়ার ঘেন্না লাগছে। তবুও প্রিয়া কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে সুকোমল কে বাড়ির ভেতরে ডাকল। সুকোমল আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরে এসে বসলেন। প্রিয়া কঠিন চোখে লোকটিকে নিরীক্ষণ করতে থাকল। প্রিয়ার মনের ভেতর টা যেন তোলপাড় হতে থাকল। বেশ খানিক্ষণ নিরব থাকার পর সুকোমল আস্তে আস্তে মুখ তুলে প্রিয়ার দিকে তাকালেন। দৃষ্টিটাতে এমন কিছু ছিল যাতে প্রিয়া খুব বেশিক্ষন কঠোর চোখে তাকিয়ে থাকতে পারল না। মুখটা নামিয়ে নিল। সুকোমল হটাৎ তার পকেট থেকে একটি চিঠি বের করে প্রিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। প্রিয়া আরও অবাক হয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল...... “কি এটা”? সুকোমল বলেন,...... “এই চিঠিটি গত কদিন আগে আমি পেয়েছি। চিঠিটি রজনী আমাকে লিখেছিল”। প্রিয়া যেন বাক্‌রূদ্ধ হয়ে পড়ে। মনের ভেতর হাজার প্রশ্ন ভীড় করে ওঠে......তবে কি সে যা ভাবছিল তাই!! মায়ের সাথে সত্যি তাহলে এই লোকটির সম্পর্ক ছিল। তাহলে সে কোন অন্যায় করেনি মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। তার মা তবে তার বাবাকে ঠকিয়ে ছিল। ছিঃ ছিঃ! আর সেই মাকে সে দেবী মনে করেছিল... অনেক কিছু একসাথে ভেবে ফেলে প্রিয়া। এবারে আর নিজের রাগ সামলে রাখতে পারল না প্রিয়া...চিৎকার করে উঠল সে...... “কেন এসেছেন আপনি এখানে?? কে সাহস দিয়েছে আপনাকে এখানে আসবার??” নিজেকে আর আটকাতে পারল না প্রিয়া। সুকোমল কিন্তু তবু কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল না। চুপ করে বসেই রইল। প্রিয়ার রাগ বাড়তে লাগল। আবার চিতকার করে উঠল কেন বসে আছেন আপনি এখানে কি বলতে এসেছেন এখানে আমার মায়ের মৃত্যুতে সহানুভূতি দেখাবেন বলে?? আপনাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিজেদের মধ্যেই রাখুন। আমাকে খবরদার এসব নোংরামির মধ্যে জড়াবেন না”। সুকোমল কিছুক্ষণ নিরব থেকে ধীরে ধীরে বললেন, “ তুমি ভুল বুঝেছ প্রিয়া। আর সেই ভুল ভাঙ্গাতেই আজ আমাকে এখানে আসতে হল। তোমার দেবীর মত মাকে দয়া করে ভুল বুঝো না। তিনি সত্যিকারের দেবী ছিলেন।
“রজনী আর আমি ছেলেবেলাকার বন্ধু ছিলাম। পাশাপাশি বাড়ি তাই এক সাথে খেলাধূলা পড়াশোনা সবই এক সাথেই ছিল। দেখতে দেখতে আমরা বড় হয়ে গেলাম। আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে আমাদের বাড়ির লোকেরা কখনও কোন অভিযোগ করেন নি। আমরা নিজেরাও কখনও বন্ধুত্বকে অন্য কিছু ভাবতে পারিনি। অথচ দু জনেই দুজনের সব ব্যাপারে খেয়াল রাখতাম। এই বন্ধুত্বের মধ্যেই কখন মন দেয়া নেয়া হয়ে গিয়েছিল দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝতে পারলাম যখন রজনীর বিয়ের ব্যবস্থা হতে শুরু করলা। রজনী নিজেও তখন উপলব্ধি করতে পেরেছিল বোধ হয়। কিন্তু কেন জানিনা দুজনের কেউই কথাটা মুখ ফুটে বলে উঠতে পারলাম না। তখন আমি চাকরী বাকরি করিনা তাই যতই ছেলেবেলার বন্ধু হোক সাহস করে বিয়ের কথা আর বলতে পারলাম না ওদের বাড়িতে। রজনীও চুপচাপ কোন প্রতিবাদ না করেই বিয়েতে রাজি হয়ে গেল শুধু আমার দিক থেকে কোন সাড়া না পেয়ে। রজনী বিয়ের পর শুধুমাত্র আমাকে এড়াবার জন্যেই বলতে গেলে বাপের বাড়ি প্রায় যেতই না যাতে আমার মুখোমুখি ওকে পড়তে না হয়। এরপর হটাৎ একদিন খবর পেলাম রজনীর স্বামী মারা গেছেন। নিজেকে আর কিছুতেই থামাতে পারলাম না। মনে হল রজনী বোধ হয় ভীষন একা ওই সময় যদি ওর পাশে আমি দাঁড়াতে পারি ও যদি এবারে আমাকে ওর জীবনের কোন কোণে সামান্য একটু আশ্রয় দেয় তাই ওকে সেদিন ওই চিঠি আমি লিখেছিলাম। তখন সাহস আরও বেড়েছিল এই কারণেও যে তখন আমি ভাল চাকরিও পেয়ে গেছি নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তখন প্রবল মনে হয়েছিল। খুব আশা করেই চিঠিটা ওকে লিখেছিলাম। কিন্তু ওর তরফ থেকে কোন সাড়াই পেলাম না। বুঝতে পারলাম আমি খুব বড় ভুল করেছি। রজনীর সঙ্গে ছোট থেকে বড় হয়েও আমি রজনীকে চিনতে বড় ভুল করে ফেলেছি। তারপর থেকে কখনও রজনীকে আমি বিরক্ত করিনি।কিন্তু মনে মনে আমি রজনীর জায়গায় আর কারোকে বসাতেও পারিনি। তাই কোনদিন ও বিয়ে করিনি আর। বহু যুগ পরে হটাৎ ১ সপ্তাহ আগে আমি এই চিঠি পাই রজনীর কাছ থেকে। কিন্তু চিঠিটি আমার হাতে আসে গত কালকে। কেন কি আমি দেশের বাইরে গিয়েছিলাম, গত কালই ফিরেছি। চিঠি পড়ে হতবাক হয়ে যাই। রজনী যে আমার চিঠিটি যত্ন করে রেখে দিয়েছে সেটা আমি কোন দিন কল্পনাও করে উঠতে পারিনি। রজনীর ওই চিঠি পড়লেই তুমি বুঝতে পারবে প্রিয়া রজনী মৃত্যুর আগেই জেনেছিল যে তুমি সেই চিঠির কথা জানতে পেরে গেছ এবং তার জনন্যেই রজনীকে ভুল বুঝেছ আর সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতেই রজনী একটি বার আমাকে আসতে বলেছিল এখানে। কিন্তু আমার আসতে বড় দেরী হয়ে গেল মৃত্যুর আগে রজনী এবং তোমার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকে গেল অনেক কষ্ট মনে রেখে রজনীকে যেতে হল। আর এইসব কিছুর জন্যে দায়ী শুধু আমার একটি চিঠি। আমি তাই তোমার কাছে আজ এসেছি ক্ষমা চাইতে প্রিয়া। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। রজনীর কাছে ওই চিঠির জন্যে কখনও ক্ষমা চাইবার সাহস করিনি কিন্তু আজ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও প্রিয়া তাহলে আমি একটু শান্তি পাই”।
কথা গুলো এক নিঃশ্বাসে বলে সুকোমল থামলেন। প্রিয়া এতক্ষন শুধু পাথরের মত কথা গুলো শুনে যাচ্ছিল। কিছু কিছু কথা তার কানে যাচ্ছিল কিছু যেন অন্য কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিল। নিজের মধ্যে থেকে ওর নিজস্বতা হারিয়ে যাচ্ছিল। সে কত বড় ভুল করে ফেলেছে। তার মাকে সে কি সব কথা বলে ফেলেছে। কেন এত খারাপ ভাবল সে তার মাকে। যে মা তাকে বুক দিয়ে আগলে বড় করে তুলল সে কিনা তার প্রতিদান এইভাবে দিল। সব হিসেব নিকেষ যেন উল্টে পাল্টে যাচ্ছিল। প্রিয়া আর কোন কথা বলতে পারলনা চুপ করে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মায়ের ছবির সামনে গিয়ে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। প্রিয়ার মনে হয় তার চারপাশ দিয়ে সময় টা আজ যেন বড় দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে আর সে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে কিছুতেই কোন কিছু কে সে আটকে রাখতে পারছেনা আর খালি হাত বাড়িয়ে সব কিছু ধরতে যাচ্ছে আর সব যেন অনেক অনেক দূরে সরে যাচ্ছে তার থেকে। দূরে তার মা তাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছেন কিন্তু প্রিয়া অনেক চেষ্টা করেও মায়ের কাছে যেতে পারছে না।।“আর একটু খানি আর একটু খানি হাত টা বাড়াও মা আমি তোমার হাত ধরতে পারছিনা মা.........” চিৎকার করে ওঠে প্রিয়া............।




আমি ঝুম। দোহা-নিবাসিনী। স্বামি পুত্র নিয়ে সংসার। আড্ডা, রান্না বান্না আর লেখালেখি এই আমার শখ।

20 comments:

  1. jhum khub sundor likhechis.... ek nissase pore ses korlam, priyar manosik tanaporen koto sohoje phutiye tulechis... darun ekta tantan golpo upohar jonne onek onek dhonnobad

    ReplyDelete
  2. ঝুম তোর লেখা গল্পটা পড়ে বড্ড ভালো লাগল,মনের টানা-পোড়েন টা এতো সহজ কথায় ফুটিয়ে তুলেছিস,তথাকথিত লেখিকাদের থেকে কোন অংশে তুই কম নয়...

    ReplyDelete
  3. darun golpo jhum. priyar manoshik abasthata eto bhalobhabe phutie tule cho je pore kanna peye jachilo. - Sumana

    ReplyDelete
  4. ottyanto bhalo akta golpo poRlam......bhalo lekha...

    ReplyDelete
  5. ottyanto sukhopathyo golpo..bhalo golpo..... ebong.........bhalo laglo...

    ReplyDelete
  6. osadharon !!! toke ageo bolechhi, tor lekha khub sundor :) ..Bidula

    ReplyDelete
  7. Jhum anoboddo lekha...amar bhison bhalo lageche

    ReplyDelete
  8. khuub sundor lekha, porte porte chokhe jol chole eseche. ma meyer somporker bondhuuto, oviman khuub sundor fute utheche. :)

    ReplyDelete
  9. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  10. khub bhalo laglo.porte porte kanna ese jachchilo.

    ReplyDelete
  11. tomar golpo chokhe jol ene dilo jhum di

    ReplyDelete
  12. asadharan lekha jhum.....mone galpo tar resh roye galo.....

    ReplyDelete
  13. sokol ke amar golpo somoi niye porbar jonne ar eto prosongsa diye voriye debar jonne osonkhyo dhonnobad janai. tomader sokoler valobasa amake aro likhte onupranito kore tulbe.

    ReplyDelete
  14. tomar sathe alap nei,tabe lekhata mon chhu(n)ye galo...

    ReplyDelete