
আমি নাজনিন। যদ্দিন আম্মা-বাপের ঘরে ছিলাম ইস্কুলে পড়তাম। গেরামের মেয়ে হলেও তাই শহুরে ভাষা কইতে পারি। মাঝেসাঝে দেশের বুলি কয়ে ফেলি আর তাই শুনে মোটাবাবুর বাড়িতে হাসির ধূ্ম পরে। ফুরসত মিল্লেই আমাকে ডেকে গেরামের ভাষা কইতে কয়। আমিও কই। বাংলা আমি লিখতেও পারি,ইংরেজি কথাও গোটাকতক জানি। মাথাটা সাফ ছিল কিন্তুক ইস্কুলের পড়া ভালো লাগত না, বই খুলে ঘর-সংসার আর পুলাপানের স্বপ্ন দেখতাম। বাপে চাইত আমি পড়ি, চোদ্দ পুরতেও তাই বিয়া দিলনা। এদিকে হারু আসতে-যেতে ইশারা করে। পুকুর পারের রাস্তায় একদিন খপ করে হাত ধরে টেনে নে...সে আর কি কই, বড় লাজ লাগে। সে আবার আমারে ‘নাজ’ ডাকে। এইডা আমার আরেক স্বপ্ন। আমারে কেউ আদর করে ‘নাজ’ ডাকুক। ও আল্লা, কেউ কয় ‘নাজু’,কেউ ‘নাজি’...কেউ আর ‘নাজ’ কয় না। সব মিলে-জুলে অই হারুর সাথেই পালালাম একদিন। পালানো ছাড়া উপায় ছিল না, হারু যে হিঁদু। আম্মার গলা থেকে পাতলা হারখানা খুলে নেওয়ার কালে বড় মায়া হচ্ছিল, রোগা ভাই-বোন গুলো্কে চুমো দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তুক তখন আর যে উপায় নাই, বড়্ রাস্তার ধারে হারু দাঁড়ায়ে আছে।
আম্মাগো,এই নাকি কলকাতা! গিশগিশ করছে লোক, বিটিগুলান রং মেখে রাস্তায় দাঁড়ায়ে আছে। হারু বল্ল,এই নাকি এখান কার রিত্। সাঁঝেরকালে এমনি করে সব হাওয়া খায়। তাহবেও বা বাপু। কানঘেঁষে একখান ইয়া লম্বা ঘরঘরে গাড়ি গেল, তার নাম নাকি টেরাম। এরচেয়ে টেরেন ভালো। কত্ত জোরে চলে, এমন গুড়গুড়িয়ে না। একটা উঁচুবাড়িতে নে তোল্লো হারু। একটা শুটকোপানা বউ দরজা খুললো, খেতেও সেই দিল, তারপর পুরো সাতদিন হারু আমাকে ছিড়ে-খুঁড়ে খেলো। যত বলি,চল কলকাতা ঘুরে দেখি একটু;কেবল বলে,পরে। কেন যে অত তাড়াহুড়ো তা বুঝলাম আরও দুদিন পর। এই দুদিন হারু ঘরে আসেনি কো, আমি দাঁতে কুটোটাও কাটিনি কো। চোখ দিয়ে কেবল পানি পড়েছে। দুদিন পর রেতেরকালে শুটকোবউটা এসে বুল্লে হারু এয়েছে। লাফিয়ে উঠে চোখে মুখে পানি দে দোর খুল্লাম...আল্লাগো, কোথা হারু!! কালো মুষকো একটা লোক এসে জাপটে পেড়ে ফেলল ভুঁয়ে। তারপর রাতের পর রাত,একজন,দুজন,পাঁচজন। তারপর কি রোগে ধরল,আমসির মত শুকিয়ে যেতে লাগলাম। খদ্দের জোটে না। শুটকোমাসি বড় অত্যেচার করতে লাগল। বড় কষ্ট দিত,সব ত কইবার মতও নয়কো। দর কমেছে বলে পাহারাদারিও কমে গেছিল, একদিন দুপুরকালে দিলাম ছুট...ঘন্টাতিনেক নাগাড়ে হেঁটে-দৌড়ে যেখেনে পৌছুঁলাম, সেখেনে উচুঁ সব বাড়ি। বাইরে তেমন পালিশ নেই কো, কিন্তুক ভিতর থেকে বেরুনো বাবুদের ভারী জোলুষ। কপাল ঠুকে একটা বাড়ির দোতালায় গিয়ে কড়া নাড়লাম। তখনি অই মোটাবাবু দরজা খুলল। বিস্তর পুঁছতাছ করে তবে আমায় ঝি রাখল। তাও বড্ড অল্প টাকায় রাজি হয়েছিলাম তাই। নইলে রাখত কিনা সন্দ। পেটের খিদে মিটতে শরীলের খিদে চাগাড় দিল। তা মোটাবাবু আর তার তিন ছেলে সে দুকখোও রাখল না। তবে অরা জানত আমার ঋতু হয় নি কো। শরীলটা শুকিয়ে গেছিল,তাই সতেরোকে বেমালুম এগারো বলে চালাতে পারলাম। মোটাবাবুর নাতি-পুতিদের দেখতাম, নিজের পুলার স্বপ্ন আর ভুলেও দেখতাম না।ও আল্লা,একদিন টের পেলাম,পুলা হবে। চেষ্টার কিছু কমতি করি নাই, তবু পেটের পুলাডা বাড়তে লাগল। বাইর হবার উপায় নাই, টোটকাই ভরসা। ভয়ে অন্তরটা শুকায় যেতো। গিন্নিরা ত তাকায়েও দেখত না, কত্তারা কেউ টের পায়নি রক্ষে। পেট হয়ওনি কো তেমন। চিন্তায় মরার দশা তখন। আটমাসে ব্যথা উঠল একদিন দুপুরে...ততদিনে য্যান একটুকু টান হইছে। ভাবছি,পুলাটারে লয়ে নয় দেশেই চলে যাব। আম্মা ত আর ফেলবে না। বেলেড একখান লুকায় নিয়ে ছাদে উঠলাম...আধাঘন্টার ভিতর নাড়ি কেটে পুলাটাকে যখন কো্লে নিচ্ছি,তখন কি মায়া কি মায়া। কিন্তুক এ কি,এ যে বিটি!আমার পুলা কই! ও আল্লাগো এ কি খেল খেল্লে আমার লগে। এক নাজু লড়াই দিছে,আবার আরেক নাজুরে পাঠালে। আর যে লড়নের শক্তি নাই কো। মায়া সব কোথা গেল, তুলে দিতে গেলাম এক আছাড়। মর,তুই মর। ও আল্লা রে, হাত ফসকে বিটি পড়ল নিচে যে। কি করি এবারে। নিজেরে বাঁচাই ক্যামনে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে শ্বাস টেনে টেনে লুকালাম চিলেকোঠায়। ও আল্লা, আলো যে কিছুতে মরে না, আমি কোথা লুকাই নিজেরে...হাজারে বিজারে মানুষ ঘিরে ধরছে আমারে...মোটাবাবুরাও আছে য্যান...আর কত মারবে গো,শরীলে কি আর কিছু আছে...কেডা ডাকে ‘আম্মা আম্মা’ করে...অ বিটি, আর জম্মে কোলে আসিস, সোনাডা....গো্লাভরা ধান তুলব তো্র বাপজান...বুকে নিয়া দুধ দিমু তরে...আম্মা গো...।

আমি শাশ্বতি মুখার্জী...আমি সিঁথি, কলকাতায় থাকি। আমি বিবাহিতা, এক কন্যার মা। আমার শখ গল্প লেখা, গান গাওয়া।
ek kothai osadharon.... khub sundor likhecho tumi.. anadikalin duto kothin somossa eto sundor kore tule dhorecho tomar chotto golpe, pore khub e bhalo laglo
ReplyDeletekhub bhalo likhechho Shaswati.. nirmed chhoto golpo.
ReplyDeletekhub valo laglo pore...sundor kore likhecho tumi...
ReplyDeleteekta mon kemon kora golpo.. ashadharon laglo .. bishesh kore sesher line koikta..
ReplyDeletebhishan bhalo laglo ..... lekhar style khub sundor....next blog e aro lekha chai!
ReplyDeleteSuparna Mitra
eto bhalo legechhe tomar ei galpo pore. seshta to puro galpotakei ekta alada matra diechhe , amader somajer kato andhokar diik je tule dhorechho.
ReplyDeletekhub sundor lekhata... pore khub bhalo laglo...
ReplyDeleteভাষা-ভাব দুটোই অনবদ্য
ReplyDeleteosadaran likhecho Saswati....etotuku porishore emon nitol ekta golpo ...khub bhalo laglo.
ReplyDeletekhub sundor likhecho...
ReplyDeleteEk notun dhoroner lekha porlam.
ReplyDeleteThis comment has been removed by the author.
ReplyDeletetomader bhalo legechhe,etai amar sobcheye boro prapti.asonkhyo dhanyabad amake anuprerana deoar jonyo.
ReplyDeleteতোমার লেখা পেশাদারী লেখকের মত,ভীষণ পরিণত, সাবলীন। লেখার style টাই আমাকে বেশী মুগ্ধ করল।
ReplyDeletechomothkar laglo tomar lekha, tobe bangal bhashatake porer bar aro ektu ghoshe meje niyo...:)
ReplyDeletesimply superb!!! It is very difficult to write this type of stories.
ReplyDeletekhub sundor jhorjhore, mormosporshi lekha.[:)]
ReplyDeleteebarer blog-e ei golpotai amar sobcheye beshi bhalo laglo:)...
ReplyDeletekhub bhalo hoyacha didi...darun.....
ReplyDeleteanabadya lekha.....mon chuye galo......
ReplyDeleteMore comments to come definitely but from me....Tor Ei Guntao Chilo Jantam Na to!!...OSADHARON...ODVUT...OTULONIO...Keep it up ...chalie ja...Thamish Na
ReplyDeleterupsa onobodyo lekha. osomvob sundor vasar bunot. ekdom pesadari lekha. porer blog e tomar aro emon golpo porbar ashai roilam.
ReplyDelete