সে প্রায় বছর বারো আগের কথা।আমরা চার পরিবার চলেছিলাম জঙ্গল ভ্রমনে।তখন আমার ছোট ছেলে হয়নি।বড় ছেলের স্কুলের তিন খুদে বন্ধু তাদের বাবা, মা নিয়ে বারো জনের দল।যেমন হয় আরকি, ছেলেদের স্কুলে ঢুকিয়ে আমরা কলেজ জীবনের মত চুটিয়ে আড্ডা দিতাম।এমন একটা আড্ডাতেই প্ল্যানের সূচনা।মিতালি, ছন্দা, নন্দিনী আর তাদের বরেরা।চার বিচ্ছুর নাম রিট্টু,বাবাই,ঋষি ও গুড্ডু।আমাদের গন্তব্য ছিল জলদাপাড়া , গরুমারা, চাপরামারি, মিরিক, দার্জিলিং।
সবাইকে সপরিবারে আমাদের বাড়িতে ডেকে বেশ পাকাপাকি প্ল্যানটা ছকে নেওয়া হল।শিলিগুড়িতে আমার বড় মামার বাড়ি।আমার মামাতো দাদা-ই জলদাপাড়ায় হলং এবং মিরিক আর দার্জিলিং-এ হোটেল বুক করে দিল।গরুমারা-য় আমরা ছিলাম ওখানকার বিট অফিসারের ঠিক করে দেওয়া ফাঁকা দুটো কোয়াটার্সে।দার্জিলিং মেল-এ এনজেপি যেতে সময় কম নেয় বলে আমরা ঠিক করলাম তিস্তা তোর্সা-য় যাব।বোঝ কান্ড, আড্ডাটা ষোলোআনা হওয়া চাই। ট্রেনে কাটল দুপুর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত। লাঞ্চটা করে বেরিয়েছিলাম। সন্ধের স্নাক্স আমি নিয়েছিলাম শামি কাবাব সাথে পেঁয়াজ কুচি,লেবুর রস আর ফ্লাস্কে কফি। নন্দিনী নিয়েছিল লুচি,চিকেন কষা। ছন্দা নিয়েছিল পনীর এর একটা প্রিপারেশন। মিতালিটা কুঁড়ে, ও মিস্টি আর স্প্রাইট কিনে নিয়েছিল। আড্ডা আর খাওয়া দাওয়া ট্রেন থেকেই জমে গেছিল তার সাথে কুচোগুলোর দৌড়াত্ম।
সকালে আমার দাদা এনজেপি তে একটা বড় গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল হলং।শিলিগুড়ি থেকেই গাড়িতে বিস্কিট, কেক, চানাচুর, বাদাম, জলের বোতল, কোক এর বোতল, বিয়ার এবং হুইস্কি প্রচুর তুলে নিল। শিলিগুড়ি শহর ছাড়িয়ে সেবক রোড ধরে কিছু পথ চলার পরেই হিমেল বাতাসের প্রথম স্পর্শ পাবার সাথে সাথেই দূরে সবুজ পাহারশ্রেনী চোখে পড়ল। মন এক অনন্য ভালোলাগায় মাতোয়ারা হয়ে উঠল।আমরা গান গাইতে গাইতে পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের কোলে, যেখানে নীলচে সবুজ তিস্তা, পাহাড়ের সাথে উদ্দাম খেলায় মেতে চঞ্চলা হরিনীর মত ছুটে চলেছে।পথের ওপর নুইয়ে পরা বড় বড় গাছময় পাহাড়ের গা বেয়ে পথ।একটা ব্রীজ পেরিয়ে আর-ও কিছুটা পাহাড় পেরিয়ে আমরা সমতল ডুয়ার্সে পড়লাম।
ডুয়ার্স আমার বরাবরের প্রিয় জায়গা।ডুয়ার্সের জঙ্গল,রাস্তার দুপারের চাবাগান,পথ চলতে দেখা মদেশিয়-দের গ্রাম,মাঠ-ঘাট, চাষের জমি সব মিলে অপূর্ব নিসর্গ দৃশ্য।এতদিন পর সব যে পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে আছে এমন দাবী করবনা।সম্ভবত আমাদের যাবার পথে মালবাজার পড়ল, আমরা কিছু খেয়ে আবার রওনা দিলাম হলং এর পথে।
মাঝ জঙ্গলে বিশাল বিশাল ঘর-ওয়ালা কাঠের দোতলা সরকারি লজ হলং। আমাদের সবারই ঘর পড়ল দোতলায়।আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে বাংলোর হাতা দেখা যায়।বাংলো চত্বর কাঁটা তারের বেড়ায় ঘেরা, যার ওপারে নিবিড় জঙ্গল।সবুজ আর সবুজ।প্রাণ জুড়োনো,চোখ জুড়োনো সবুজ। বারান্দা থেকে দেখলাম বস্তায় রাখা নুন খাচ্ছে গন্ডার।নুন যে শুধু শুধু খেতে পারে কোন-ও প্রাণী তা সেই প্রথম জানলাম।লাঞ্চের পর একটু জিরিয়ে নিয়ে বেড়োলাম ওয়াচ্ টাওয়ারের উদ্যেশ্যে। প্রচুর পাখি আর হরিন ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লনা। আমরা বড়রাতো বটেই, সবচেয়ে বেশী উত্তেজিত ছিল বাচ্চারা। রিট্টুতো “চিতা কখন আসবে মা? চিতা কি লাফ দিয়ে এত ওপরে উঠতে পারে? হাতির গায়ে কত জোর?” প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করে দিচ্ছিল।সময়টা তখন শেষ অঘ্রাণ।ঝুপ করে কুয়াশা জড়ানো সন্ধেটা নেমে এল।গাড়ি যখন বাংলোতে আবার ফিরে এল তখন মিশ্র পাখীর কলতানে আমরা বিমো্হিত,বাকরূদ্ধ।
পরদিন সকালে যেমন হয় আরকি, হাতির পিঠে চড়ে জঙ্গল ভ্রমন।ছোটদের কথা বলাই বাহুল্য আমরাই কেমন ছোট হয়ে গেছিলাম।আমাদের সামনের হাতির সাথে তার ছানাও চলছিল ছোট্ট শূঁড় মায়ের লেজে জড়িয়ে। সে যে কি মজার লাগছিল দেখতে! মাহুত গাছের ডাল কেটে কেটে আরও আরও গভীর জঙ্গলে নিয়ে ঢুকছিল।যেখানে গাছের মাথারা ঘন হয়ে পর্যাপ্ত আলো ঢুকছেনা।সেদিন প্রথম অনুভব করেছিলাম জঙ্গলের অদ্ভুত শব্দ ও গন্ধ।ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আমার কেমন গা ছম্ ছম্ করছিল।বরকে ক্রমাগত ফেরার তাড়া দিচ্ছিলাম।এই বুঝি কোন অজানা জন্তু ঝাঁপিয়ে ঘাড়ে পড়ে। তেমন কিছুই ঘটলনা বলে রিট্টু ব্যর্থ মনোরথ হয়ে লজে ফিরল।
পরদিন গেলাম গরুমারা-য়।ওখানকার বিট অফিসার প্রকৃত পশুপ্রেমী,সহৃদয় ব্যাক্তি।আমার মামাতো দাদাও জঙ্গলপ্রেমী হওয়ায় বহুবার ওঁর আতিথেয়তা পেয়েছে এবং এক অসমবয়সী সখ্য গড়ে উঠেছিল।দাদার এক কথায় উনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমাদের দুটো ফাঁকা কোয়াটার্সে থাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন।সবচেয়ে লজ্জার হল উনি আমাদের কোন-ও খরচ করতে দিলেননা শত অনুরোধেও।সদ্য যুবক-যুবতী এক নেপালি দম্পতি আমাদের জল দেওয়া,রান্না করা,বাসন মাজা,পরিবেশন যাবতীয় কাজ করে দিত।অমন সদাহাস্যময় কর্ম পরায়ন দুটি মানুষ আমাদের মুগ্ধ করেছিল।
সত্যিকারের জঙ্গল দেখার অভিঞ্জতা আমাদের ওখানেই হয়েছিল।পৌঁছন মাত্র জানলাম জঙ্গলে খুউব উত্তেজনা।উত্তেজনা এক হাতিকে ঘিরে।সদ্য সাথীহারা নায়িকা বিরহে দলছুট হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।দলছুট জংলী হাতির চেয়ে ভয়ানক কিছু জঙ্গলে হতে পারেনা।সেই হস্তিনি আবার আমাদের বিট অফিসারের খুব প্রিয়।কিছু বছর আগে সে যখন ছোট্ট ছিল কোনো কারনে একদল গন্ডার তাকে আক্রমণ করে।তারপর এই অফিসার দলবল নিয়ে বাচ্চাটাকে উদ্ধার করেন ও নিজের কাছে রেখে শুশ্রষা করে আবার দলে ফিরিয়ে দেন।তারপর উনি যখনই ওকে দেখতে গেছেন ও শূঁড় দিয়ে আদর করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।ওনার কোয়াটার্সের পাশ দিয়ে যাবার কালে বৃংহন করে জানান দিয়েছে।এই সব গল্প জঙ্গল কর্মী ও বিট অফিসার দাদার মুখেই শোনা।সেই হস্তি শাবক ততদিনে সদ্যযৌবন প্রাপ্তা।এও জানলাম হস্তিকূলেও মাধুরী,শাহরুখ আছে।শাহরুখ তার চেলা চামুন্ডাদের নিয়ে সিটি বাজাতে আসে যেখানে মাধুরী সখীদের সাথে সমবেত হয়।মাধুরী যথারিতি শ্রেষ্ঠ পুরুষ হাতিটিকে বেছে জুটি গড়ে।তো এই মাধুরির শাহরুখ বেওফাই করে জু্হিকে খুঁজে নিয়েছে।আর এই পাগলিনীর নানা রকম উৎপাত অত্যাচার বেড়েই চলেছে।এমন চললে ওর প্রাণটা যাবে এই ভয়ে আমাদের বিট অফিসার দাদা টেনশনে ছিলেন।এমন মায়া পড়ে গেছিল ওর প্রতি যে কতকটা ওর টানেই অন্য কোথাও ট্রান্সফার নিচ্ছিলেন না উনি। ক্ষো্ভের সাথে চোরা শিকারীদের কথাও বললেন।
রাতের খাবার ছিল পুরু রুটি,বন মোরোগ কষা আর স্যালাড, সাথে হুইস্কি...যারা খাবে।ছেলেদের তো তার আগে থেকেই চলছিল, আমরা মেয়েরাও ক’জন সেদিন যোগ দিলাম।আহা কি স্বাদ ছিল সেই নেপালি মেয়ের হাতের রান্নার!আমাদের প্রদীপদা, নন্দিনীর বর ছিলেন গল্পের ভান্ডার।বেশ ঝিমধরা মস্তিষ্কে মাঝে মাঝে জংলী অজানা নিশাচর জানোয়ার বা পাখির ডাক মাখানো পরিবেশে গল্পগুলো অনন্য মাত্রা পাচ্ছিল।সেদিনের আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল মধ্যরাতের জঙ্গল অভিযান।নন্দিনী ক্লান্ত বোধ করছিল ও যেতে চাইল না।ওর জিম্মায় ছানা-পোনাদের রেখে আমরা রওনা দিলাম।
পূর্ণিমার রাত ছিল।দাদা-ই গাড়ি এবং দুই বন্দুকধারী সাথে দিয়ে দিয়েছিলেন।কুয়াশা থাকায় জ্যোৎস্না তেমন দীপ্ত ছিলনা, ফ্যাকাশে একটা আলো দিচ্ছিল।মিতালি আর ছন্দার বরের তখনও তেষ্টা তখনও মেটেনি তাই নৈশ এ্যাডভেঞ্চারে কিংফিশার স্ট্রং সাথে নিল।গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা।ডিজেল জীপের ঘরঘরে আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।খুব ধীর গতিতে জীপ চলছে।আমাদের কথা বলা মানা।কৌতুহলী দৃষ্টি জানলার বাইরে নিবদ্ধ,উত্তেজনায় টানটান।
আমিতো ভীতুর ডিম আবার যাওয়াও চাই।কিন্তু রাতের জঙ্গলের ওই ভয়ার্ত রূপ আমি প্রতিটা উপশিরায় উপভোগ করেছি।মাঝে মাঝেই পেঁচা আর তক্ষক ডেকে উঠছিল।কখনও খশ্ খশ্ শব্দে ঝোপের ভেতর কিছুর সেঁধিয়ে যাওয়া অনুভব করছিলাম।সরু রাস্তা ছেড়ে একসময় একটু খোলা একটা জলার কাছে আমাদের গাড়ি পৌঁছল।ঠান্ডা তো ছিলই এইখানটায় এসে শিরশিরে হাওয়ায় শালটা ভাল করে মুড়ে নিলাম।জানলাম অগভীর জলাটা আমরা গাড়ি করেই পেরিয়ে যাব।জলার এপারে আবছা শীর্ন কতকগুল গাছ।
গাছ পেরিয়ে জীপ জলে নামতেই দেখি হাতির পাল! অনেক অনে-এ-ক হাতি।গোনার মত সাহস বা মন কোনোটাই তখন ছিলনা।কুয়াশা ছেঁড়া চাঁদের আলোর জলের তরঙ্গে তির্ তিরে কম্পন আর দশ হাত দূরে হস্তিযূথ।কেউবা জলে কেউবা ডাঙায়,কেউবা বসে কেউবা দাঁড়িয়ে।এত কাছথেকে জংলা হাতির পালের ভয়ানক সৌন্দর্যে আমরা অভিভূত! মিতালির হাতব্যাগে ক্যামেরাটা থেকে গেছিল।আমার বরের হাতে দিয়ে নি:শব্দে ছবি তোলার ইচ্ছাপ্রকাশ করল।তখন এত নাইট মোড-অলা ক্যামেরার প্রচলন হয়নি।ও বলেছিল, “ফ্ল্যাশের আলো পড়লে আমাদের সমেত এই জীপটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে ওই দলের মাত্র একজন-ই যথেষ্ট।”জলার ওপারে পৌঁছে জীপকে দুদন্ড দাঁড় করাবার অনুমতি দিয়েছিল রক্ষিরা।
পরদিন দুপুরে পুনরায় দাদার আতিথেয়তায় সেই নেপালি বধূর অসামান্য রান্না খেয়ে আমরা চাপরামারির পথে পারি দিলাম।যাবার আগে দাদাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা নেপালি দম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে হাতে কিছু বকশিস গুঁজে দিয়ে এলাম।
আবার সেই দুপাশে জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পথ।শাল,তমাল,সেগুনের ঘন জঙ্গল আর সাথে সেই মনমাতানো গন্ধ ও শব্দরাশি।এখানকার ওয়াচটাওয়ার থেকে দেখলাম গন্ডার,বাইসন,হরিন,নানা রঙের পাখি।
তারপর ফিরলাম শিলিগুড়ি, বড়মামার বাড়ি ইয়া বড় বড় চিতল পেটি আর কচি পাঁঠার মাংস সহযোগে রাজকীয় ডিনার।জঙ্গল পর্ব এখানেই শেষ।তারপর পাহাড়।কিন্তু এখানে শুধু জঙ্গলের কথা লিখব বলেই মনস্থ: করেছি।আমার প্রথম জঙ্গল ভ্রমন যা আমাকে তীব্র আকর্ষণে বেঁধেছে জঙ্গলের প্রতি।

আমি সোমা চক্রবর্তী। স্বামীর কর্মসূত্রে বসবাস ইউ কে তে। গান করা, বই পড়া, রান্না করা বাদে লেখালেখির চেষ্টা করি।
এই সংখ্যার অন্যান্য ভ্রমণের গল্প :
ইয়েলোস্টোন
হিমাচলে হারিয়ে যাওয়া
হর কি দুন
darun lekha, chhimchham golper moto bole gechho.
ReplyDeleteporte khub bhalo legechhe ar sobtheke beshi bhalolegechhe khaoa daoar kathagulo porte..:p berate giye ota kintu khub important ekta part..
rosona o bhromon.. dui-e mile bhari monograhi ekti rochona.:)
Tomar lekha ta age o pore khub bhalo legechhilo, abar o pore phellam taratari...
ReplyDeleteRater jongoler description ta khub bhalo laglo. Chhotor thekey ai amar kaka Buddhadev Guhar lekhar bhishon bhokto, tai jongoler description bhishon taney. Tobey arektu likhley bhalo hoto...jeno hotath sesh hoye gelo
ReplyDeleteAmbar